Logo

১ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

মাঠের খেলার বাইরে ক্ষমতা ও বৈষম্যের লড়াই

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই একের পর এক ঘটনা ফুটবলের আদর্শিক চিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে, ছবি: সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

বিশ্বকাপ ২০২৬

মাঠের খেলার বাইরে ক্ষমতা ও বৈষম্যের লড়াই

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০৫ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। চার বছর পরপর এই আয়োজন শুধু ফুটবলপ্রেমীদের নয়, বরং সারাবিশ্বের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। মাঠের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিশ্বকাপ বরাবরই বহন করে বৈশ্বিক সংহতি, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং খেলাধুলার মাধ্যমে বিভাজন অতিক্রম করার বার্তা। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই একের পর এক ঘটনা সেই আদর্শিক চিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

ইরান দলের জন্য আলাদা ভ্রমণ ও অবস্থান নীতি, আফ্রিকার শীর্ষ রেফারিকে প্রবেশাধিকার না দেওয়া, ইরাকি ফুটবলারকে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ, সাংবাদিকদের ভিসা জটিলতা, হাইতির জার্সি পরিবর্তনে চাপ এবং সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া টিকিটের মূল্য—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে উঠে এসেছে বৈষম্য, বাছাই করা আচরণ এবং অন্তর্ভুক্তির সংকটের অভিযোগ। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নাকি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ—সেই প্রশ্ন এখন বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিশ্বকাপের বৈষম্য: ইরান দলের জন্য বিশেষ শর্ত

অংশগ্রহণকারী ৪৮ টিমের মধ্যে ইরানের জন্য পৃথক শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; প্রতিটি ম্যাচের আগে-পরে ইরান টিম যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবে না। অর্থাৎ, ম্যাচের নির্ধারিত দিনে মেক্সিকোর বেস থেকে জার্নি করে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইরানের প্লেয়ারদের মাঠে নামতে হবে এবং ম্যাচ শেষে আবার মেক্সিকো রওনা হতে হবে। ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল না খেলার। পরে রাজি হয় ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে। ইরানের শর্ত ছিল, তাদের ম্যাচের ভেন্যুগুলোতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ যেন স্বৈরাচারী শাহের আমলের পতাকা নিয়ে কাউকে ঢুকতে না দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ইরান তাদের স্কোয়াড পাঠাতে রাজি হয়। অনেকেই সন্দেহ করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে এবং প্রিন্স রেজা শাহ পাহলভীর দাঙ্গাবাজ সমর্থকদের স্টেডিয়ামে ঢুকিয়ে ইরানের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।

ইরাকের সেরা খেলোয়াড়কে বিমানবন্দরে সাত ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ

"ফিফাকে অভিনন্দন এমন একটি দেশকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য, যারা এমন একজন খেলোয়াড়কে ৭ ঘণ্টা আটকে রাখতে পারে যিনি মাঠে তার পারফরম্যান্স ছাড়া অন্য কোনো কারণে কখনোই সংবাদ শিরোনামে আসেননি।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী ইরাকের শীর্ষ স্কোরারকে যখন স্বাগতিক দেশে পৌঁছার পর তার সঙ্গে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির মতো আচরণ করা হয়, তখন নির্দিষ্ট কিছু দল (ইরান) এবং তাদের সমর্থকদের জন্য কেমন অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে তা ভেবে অবাক না হয়ে পারা যায় না।
কয়েক বছর আগে থেকে কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে, মন্তব্য করা হয়েছে এবং সমালোচনা করা হয়েছে। আশা করি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একই স্তরের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও মিডিয়া কভারেজের মুখোমুখি হবে।
সাবাশ, মিস্টার ইনফান্তিনো।"
—ফ্রান্সে ইরাকি দূতাবাসের পোস্ট। বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছেছে ইরাকি টিম। অবতরণের পর মার্কিন বিমানবন্দরে ৭ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় ইরাকের কৃতি স্ট্রাইকার আয়মান হুসাইনকে। ইরাক টিমের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফারদের এন্ট্রি দেয়নি।

খেলোয়ারদের কুকুর তল্লাশি

ফাবিও কানাভারো। ওয়ার্ল্ড কাপ উইনার। ইতালি টিমের সাবেক অধিনায়ক। বালন দ'অর জয়ী ফুটবলার। মার্কিনীরা এমনভাবে তাকে সার্চ করছে যেন সে মাদক পাচারকারী।
সেনেগাল, উজবেকিস্তানসহ কয়েকটি টিমের সদস্যদের, তাদের সঙ্গে থাকা লাগেজ যেভাবে সার্চ করেছে, যেভাবে স্নিফার ডগ লেলিয়ে দিয়েছে, অতীতে ওয়ার্ল্ড কাপের কোনো হোস্ট এমন আচরণ করেনি।

হাইতির জার্সি বদল

আজ রাত থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। তার আগে হাইতিকে জার্সি বদলাতে বাধ্য করেছে ফিফা। হাইতির অপরাধ, তাদের জার্সিতে ছিল ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি।
হাইতি বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিক। ১৮০৩ সালে হাইতির স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভারতিয়েরেসের যুদ্ধে ফরাসী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। হাইতির জার্সি উদযাপন করেছিল ২২৩ বছর আগের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণসংগ্রামের বিজয়। ফিফার সহ্য হয়নি। তাদের চাপে জার্সি বদল করতে বাধ্য হয়েছে হাইতি।
ফ্রান্সের মসনদে তখন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। একদা 'বিপ্লবের সন্তান' ততদিনে 'বিপ্লবের হত্যাকারী'। কয়েক হাজার পোলিশ সৈন্যকে কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্রোহীদের কচুকাটা করতে হাইতিতে পাঠালেন নেপোলিয়ন। কিন্তু মিথ্যে কথা বলে। নেপোলিয়ন আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পোল্যান্ড মুক্ত করবেন। হাইতি পৌঁছে পোলিশ সৈন্যরা বুঝতে পারেন, তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। তাঁদের আনা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে কালো মানুষদের খুন করতে। তাঁদের অনেকে তখন বন্দুক ঘুরিয়ে ধরেন ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। যোগ দেন হাইতির স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে। হাইতির বাতিল হয়ে যাওয়া জার্সিতে তাই ছিল পোল্যান্ডের পতাকা।

দ্য ব্ল্যাক জ্যাকোবিনস। হাইতির মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে মার্কসবাদী সি এল আর জেমসের অসাধারণ কাজ।
বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে। ফ্রান্স এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট। প্রায় গোটা ফরাসী দলটাই অভিবাসীদের নিয়ে গড়া। কয়েকদিন আগে পিএসজি-র চ্যাম্পিয়ন লিগ জয়ের উৎসব প্যারিস-সহ বিভিন্ন শহরে পুলিশ বিরোধী গণবিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল। অতিদক্ষিণপন্থী শক্তির পাশাপাশি ফ্রান্সে 'অতিবামপন্থী' নেতা মেলেনশঁর বিপুল উত্থান হয়েছে৷ পরের বছর ভোট। মেলেনশঁ প্রার্থী। তাঁর গণভিত্তি তরুণ প্রজন্ম, অভিবাসী এবং শ্রমিক জনতা। জানি না ফ্রান্সের বিশ্বকাপের ফল নির্বাচনী প্রচারকে প্রভাবিত করবে কিনা।

ফিফা স্বীকৃত আফ্রিকার সেরা রেফারিকে ঢুকতে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র: ফিফা নিশ্চুপ

ওমর আরতান। সোমালিয়ার নাগরিক। রেংকিংয়ে আফ্রিকার সেরা রেফারি। বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেয়নি। অগত্যা সোমালিয়া সরকারের সাহায্য নিয়ে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্র আসেন। তারপরও এন্ট্রি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। দেশে ফিরে তিনি বীরের, সম্মান পেয়েছেন। সোমালিয়ার তরুণদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন- ‘আমরা সোমালিয়ান, সোমালিয়া আমাদের। ভাল-মন্দ যাই ঘটুক না কেন, কখনো দেশের প্রতি হতাশ হবে না। সংবাদ সম্মেলনে ফিফা সভাপতিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- আমরা চেষ্টা করছি, সবকিছু নিয়ে এত উত্তেজিত হলে চলবে না-চিল রিল্যক্স!

ভিসাবঞ্চিত সাংবাদিকরাও, প্রশ্নের মুখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম-নির্ভর ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি। মাঠের খেলা যেমন কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন সাংবাদিকরা, তেমনি বিশ্বকাপের গল্প, আবেগ, বিশ্লেষণ ও ইতিহাসও তারা তুলে ধরেন বিশ্বের সামনে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এমন এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা ফুটবলের বাইরেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের অধিকারের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
বিভিন্ন দেশের বেশ বড় সংখ্যক সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, ফিফার স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) পাওয়ার পরও তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি অথবা নানা জটিলতার কারণে বিশ্বকাপ কভার করতে যেতে পারছেন না। বিশেষ করে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং ইরানের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এটি বেশি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিক সংগঠন এআইপিএস (ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন) বিষয়টিকে "অগ্রহণযোগ্য" আখ্যা দিয়ে ফিফার কাছে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটির অভিযোগ, অনেক সাংবাদিক নিয়মমাফিক আবেদন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে ভিসা জটিলতায় পড়েছেন। কেউ কেউ সীমিত প্রবেশাধিকারের ভিসা পেয়েছেন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডা বা মেক্সিকোতে গিয়ে ম্যাচ কভার করলে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে পারবেন না। ফলে পুরো টুর্নামেন্ট কাভার করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ম্যাচগুলো তিন দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই সাংবাদিকদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা টুর্নামেন্ট পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভিসা নীতির কারণে অনেক সাংবাদিকই কার্যত বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাচ্ছেন।

বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রবেশাধিকার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার নামে যদি বৈধভাবে অনুমোদিত সাংবাদিকদেরও বাধার মুখে পড়তে হয়, তাহলে তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা কোথায় দাঁড়াবে?

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিকদের অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; বরং বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সাংবাদিকরা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেন না; তারা বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেন, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার গল্প তুলে ধরেন। তাদের অনুপস্থিতি বিশ্বকাপের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বকেও সীমিত করে দেয়।

এ ক্ষেত্রে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কথায় অসহায়ত্মই ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, কোনো দেশের অভিবাসন নীতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ফিফার নেই। তবু তিনি জানিয়েছেন, সমস্যাগুলোর সমাধানে পর্দার আড়ালে কাজ চলছে। কিন্তু অনেক সাংবাদিকের প্রশ্ন, বিশ্বকাপের মতো আয়োজনের জন্য যদি আগে থেকেই বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্বকাপ কি ধনী দর্শক ও করপোরেট গ্রাহকদের?

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি হয়ে উঠেছে টিকিটের দাম নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উন্মাদনার কমতি নেই। কিন্তু অনেকের অভিযোগ, এবারের বিশ্বকাপ যেন সাধারণ সমর্থকদের জন্য নয়, বরং ধনী দর্শক ও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে। 

এবারের বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে “ডায়নামিক প্রাইসিং” বা চাহিদাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ কোনো ম্যাচের চাহিদা বাড়লে টিকিটের দামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে। সমর্থকদের অভিযোগ, এই পদ্ধতি বিশ্বকাপকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ ফাইনালের কিছু টিকিটের মূল্য ১০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি হয়েছে। ব্রিটিশ মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮ হাজার পাউন্ডের বেশি। প্রথম দফার বিক্রির তুলনায় অনেক টিকিটের দাম পরবর্তী ধাপে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সমর্থক সংগঠন ফিফার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, বিশ্বকাপ ঐতিহাসিকভাবে ছিল সাধারণ মানুষের উৎসব। কিন্তু বর্তমান মূল্য কাঠামো সেই ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে।
অনেক সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, একটি বিশ্বকাপ ম্যাচের টিকিট কেনার চেয়ে ইউরোপে গিয়ে একটি শীর্ষ লিগের ম্যাচ দেখা সস্তা। কেউ কেউ ফিফার বিরুদ্ধে “ফুটবলকে পণ্য বানানোর” অভিযোগও তুলেছেন। 

মজার বিষয় হলো, উচ্চমূল্য নির্ধারণের ফলে অনেক ম্যাচের টিকিট বিক্রিও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্বোধনী ম্যাচসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বিপুল সংখ্যক টিকিট অবিক্রীত ছিল। অফিসিয়াল পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মেও হাজার হাজার টিকিট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। 

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিকিটের উচ্চমূল্য, ব্যয়বহুল ভ্রমণ খরচ এবং আবাসন ব্যয়ের কারণে অনেক আন্তর্জাতিক সমর্থক বিশ্বকাপে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ও বিমান শিল্পেও। 

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ন্নি ইনফান্তিনো অবশ্য তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি টিকিটের মূল্য নিয়ে সমালোচনার জবাবে বলেছেন, বিশ্বকাপ ফিফার প্রধান আয়ের উৎস এবং এই আয় বিশ্বের ২০০-র বেশি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। ফিফার দাবি, চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা আধুনিক ক্রীড়া ব্যবসার স্বাভাবিক অংশ। 

তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফিফা পরে সীমিতসংখ্যক ৬০ ডলারের বিশেষ “সাপোর্টার এন্ট্রি টিয়ার” টিকিট চালু করতে বাধ্য হয়, যা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর মাধ্যমে বিশ্বস্ত সমর্থকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। 

টিকিটের মূল্য ছাড়াও আসন বণ্টন, পুনর্বিক্রয় বাজার, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং টিকিটিং প্ল্যাটফর্মের জটিলতা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কিছু সমর্থক অভিযোগ করেছেন, তারা ব্যয়বহুল ক্যাটাগরির টিকিট কিনলেও প্রত্যাশিত মানের আসন পাননি। আবার অনেকে বলছেন, ফিফার মূল্যনীতি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। 

বিশ্বকাপ বরাবরই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর। কিন্তু এবারের বিতর্ক নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—ফুটবল কি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের খেলা থেকে ধনীদের বিনোদনে পরিণত হচ্ছে?

অর্থ আর ক্ষমতার দাপটে সংকুচিত কী ‘সাধারণের খেলা’

ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে ‘সাধারণের খেলা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বকাপও সেই দর্শনেরই সবচেয়ে বড় প্রতীক। কিন্তু যখন কোনো দেশের জন্য আলাদা নিয়ম তৈরি হয়, যখন একজন স্বীকৃত রেফারি কিংবা সাংবাদিক প্রবেশাধিকার পান না, যখন কোনো জাতির ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্মারক জার্সি বিতর্কের মুখে পড়ে, আর যখন সাধারণ সমর্থকদের জন্য স্টেডিয়ামের দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়—তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিশ্বকাপ কি এখনও সবার?
নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি কিংবা বাণিজ্যিক বাস্তবতার যুক্তি অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের সাফল্য কেবল আয়ের অঙ্ক বা দর্শকসংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। এটি মাপা হয় কতটা ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীনভাবে বিশ্বের মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছে তার ভিত্তিতে।
মাঠে শেষ পর্যন্ত কে ট্রফি জিতবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিশ্ববাসীর সামনে দাঁড়িয়ে গেছে—ফুটবল কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবে সেই সমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে? ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; বরং খেলাধুলা, ক্ষমতা, বৈষম্য ও বৈশ্বিক ন্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ।

মন্তব্য করুন

Logo