জীবিকার খোঁজে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসছে ঢাকায়, ছবি: সংগৃহীত
সব পথ কেন ঢাকামুখী
নওশাদ কামাল
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:৩২ এএম
সপ্তাহখানেক আগে হুট করে বুকে ব্যথা অনুভব করেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার আশারকোটা গ্রামের ৭০ বছর বয়সী আব্দুল মান্নান। তার স্ত্রী প্রথমে তাকে স্থানীয় একটা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিলেও পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় এসে বিপাকে পড়েন তিনি। নেই তেমন কোনো পরিচিত আত্মীয়স্বজন। হাসপাতালেও জায়গা পাচ্ছিলেন না তিনি। স্ত্রী পেয়ারা বেগম তো কেঁদেকেটে আকুল। পরে অবশ্য, এক আত্মীয়ের বাদান্যতায় চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেন তিনি।
পেয়ারা বলছিলেন, “সরকার যদি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা ভালো করত, তাহলে এই ভোগান্তিটা হত না। আমাদের তো ঢাকায় কেউ নেই। তবুও বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে।”
চাঁদপুরের শাহমিরান দেশে কোনো কাজের জোগাড়যন্ত্র করতে না পেরে ঢাকায় এসেছেন দুই মাস হল। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছেন। তার গল্পও প্রায় একই।
উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাই সাধারণ মানুষের শেষ গন্তব্য, ছবি: সংগৃহীত তিনি বলেন, “ঢাকায় ভালো লাগে না। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি। কিন্তু, উপায় নেই। গ্রামে কামাই নেই। তাই বাধ্য হয়েই ঢাকায় এসেছি।”
ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় ঝুঁড়িতে করে পেয়ারামাখা বিক্রি করেন হবিগঞ্জের লোকমান হোসেন। তিনি বলেন, “এলাকায় কোনো কাজকামের মিল নাই। উপায় না পাইয়া ঢাকায় আইছি। ঢাকায় খানার সমস্যা, পানির সমস্যা। কিন্তু, দুইটা টাকা রুজি হয়। যদি, গ্রামে কোনো কাজের ব্যবস্থা থাকত, তাইলে আজকেই যাইতাম গা।”
ঢাকায় এরকম গল্প খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। গত এক দশকে নতুন করে অসংখ্য মানুষ ঢাকায় এসে ভিড় করেছেন। করোনার সময়ে ২০২০ সালে অনেকে ফিরে গেলেও পরে আবার অনেকেই কাজ জুটিয়ে ফিরেছেন ঢাকায়। ফলে, শুধুমাত্র জনসংখ্যার চাপেই ঢাকা হয়ে উঠবে বসবাসের অনুপযোগী একটি নগরী।
রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, নীতি ও উন্নয়ন দর্শন
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আধুনিকায়নের গল্প যতটা বলা হয়, তার আড়ালে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা—অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিকতা। দেশের একজন মানুষ যদি ভালো চিকিৎসা চান, সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা চান, একটি ভালো চাকরি খুঁজতে চান, ব্যবসা বা শিল্প উদ্যোগ গড়ে তুলতে চান, কিংবা কখনো উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে চান, তাহলে তাকে শেষ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার দিকেই তাকাতে হয়। যেন দেশের সব সম্ভাবনা, সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এক শহরেই এসে জমা হয়েছে।
ফলে প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, উপজেলা ও জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার পথে যাত্রা করেন। কেউ আসেন জীবনের তাগিদে, কেউ উন্নত চিকিৎসার আশায়, কেউ বা কর্মসংস্থানের সন্ধানে। কিন্তু এই অবিরাম জনস্রোত একদিকে যেমন ঢাকার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন বাংলাদেশের একজন নাগরিককে নিজের জেলার পরিবর্তে রাজধানীর ওপর নির্ভর করতে হবে? কেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে সুযোগ-সুবিধা গড়ে উঠছে না?
রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত সংকট এবং উন্নয়নের বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই শুধু নগরায়ণের গল্প বললে চলে না; বলতে হয় একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, নীতি ও উন্নয়ন দর্শনের কথাও। কারণ ঢাকার দিকে মানুষের এই অন্তহীন যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন ব্যবস্থার প্রতিফলন।
সরকার এবং বিভিন্ন এনজিওর তরফে বিভিন্ন সময়ে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের নানারকম কথাবার্তা শোনা গেলেও বাস্তবে এটি নিয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে, দিন-দিন ঢাকা হয়ে উঠেছে মানুষের ভারে পিষ্ট। বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। কমছে নাগরিক সুবিধা। সবমিলিয়ে তথৈবচ অবস্থা প্রমত্তা এ মহানগরীর।
ঢাকা ছাড়া শিক্ষার্থীর গতি নেই
শুধু চিকিৎসা বা চাকরি নয়, মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেশের অধিকাংশ পরিবারের প্রথম পছন্দ ঢাকা। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজধানীতে আসে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা নামকরা স্কুল-কলেজে পড়ার জন্য।
শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম গন্তব্য ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, ছবি: সংগৃহীত রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল কিংবা রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও অভিভাবকদের বড় অংশ মনে করেন এবং বাস্তবতাও অনেকটা এমনই যে, ঢাকায় পড়লে শিক্ষার মান, শিক্ষক, গবেষণা সুবিধা এবং চাকরির সুযোগ বেশি পাওয়া যায়। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসে, তখন তার পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে ঢাকামুখী হয়ে পড়ে। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যদি তাকাই দেখা যায় ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে ৪৭টিই ঢাকা কেন্দ্রিক।
প্রশ্ন হচ্ছে—ঢাকার বাইরে কি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব নয়? যদি দেশের প্রতিটি বিভাগে সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য এত বড় জনস্রোত ঢাকামুখী হতো না।
বিচার পেতেও আসতে হয় ঢাকায়
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ঢাকার ওপর নির্ভরতা স্পষ্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ঢাকায় অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলা, মানবাধিকার বিষয়ক রিট, প্রশাসনিক বিরোধ কিংবা উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রতিকার পেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে ঢাকায় ছুটে আসতে হয়।
মামলার পক্ষভুক্ত মানুষদের জন্য এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। যাতায়াত, আবাসন, আইনজীবীর খরচ—সবকিছু মিলে বিচারপ্রার্থীর ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক সেবা আরও বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চ আদালতের বেঞ্চ সম্প্রসারণ করা গেলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিচারব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্রও ঢাকাতেই, ছবি: সংগৃহীতব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উদ্যোগ: ঢাকার বাইরে গেলেই পিছিয়ে পড়ার ভয়
একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করতে চাইলে প্রায়শই প্রথমে ঢাকার কথাই ভাবেন। কারণ বড় বাজার, করপোরেট অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবকিছুই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক।
দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানিরও সদর দপ্তর এখানে। ফলে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, পণ্য বিপণন, অর্থায়ন কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে উদ্যোক্তাদের ঢাকামুখী হতে হয়।
অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, ঢাকার বাইরে কারখানা স্থাপন করা গেলেও প্রশাসনের যোগাযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে ব্যবসা পরিচালনার কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত ঢাকাতেই রাখতে হয়। কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনুমোদন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র একমাত্র ঢাকা।
সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ঢাকা
মন্ত্রণালয়-সচিবালয়সহ বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। ফলে কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ব্যবসার লাইসেন্স, নীতিগত সিদ্ধান্ত কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের জন্য মানুষকে ঢাকায় আসতে হয়।
এমনকি অনেক সময় জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে সমাধানযোগ্য বিষয়ও শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে গিয়ে নিষ্পত্তি করতে হয়। এতে করে শুধু নাগরিক দুর্ভোগই বাড়ে না, ঢাকার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্র সচিবালয় ঢাকাতেই, ছবি: সংগৃহীত সাংস্কৃতিক ও পেশাগত সুযোগও ঢাকাকেন্দ্রিক
গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা— ঢাকার বাইরে এদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য নয়। ফলে সংস্কৃতি, গণমাধ্যম বা সৃজনশীল পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চাওয়া তরুণদেরও ঢাকায় আসতে হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু সুযোগের কেন্দ্রীকরণ তাদের অনেককেই রাজধানীমুখী করে তুলছে।
বৈষম্যের নগরায়ণ
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু স্বাভাবিক নগরায়ণের ফল নয়; এটি মূলত বৈষম্যমূলক উন্নয়নের প্রতিফলন। যখন একটি দেশে উন্নত হাসপাতাল, মানসম্পন্ন শিক্ষা, বড় চাকরি, ব্যবসার সুযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একটি শহরে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তখন মানুষ বাধ্য হয় সেই শহরের দিকে ছুটতে। ফলে ঢাকা শুধু রাজধানী নয়, ধীরে ধীরে দেশের প্রায় সব সুযোগ-সুবিধার একমাত্র কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
তথ্য কী বলছে
গত ২৫ বছরে সাত ধাপ পেরিয়ে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল নগর। সামনে শুধু এখন জাকার্তা। আর ২৫ বছর পর এই শহরও ঢাকার পেছনে পড়বে। তেমন আভাসই দেওয়া হয়েছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে।
ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস ২০২৫–এ বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। এরপরই ঢাকার অবস্থান। জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলেছে জাকার্তা ও ঢাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা টোকিওর পর তালিকায় আছে যথাক্রমে ভারতের নয়াদিল্লি ও চীনের সাংহাই।
ইউনাইটেড নেশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স এ প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে। প্রকাশ করা হয়েছে গত ১৮ নভেম্বর।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এখন প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছে।
২০০০ সালে ঢাকা ছিল বিশ্বের নবম জনবহুল নগর। জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। ২৫ বছরের ব্যবধানে ঢাকা তালিকায় দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। এ সময়ে ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এমন ধারা অব্যাহত থাকতে পারে আগামীতেও। ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টসে আরও বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে ঢাকা তালিকায় শীর্ষে উঠবে। তখন ঢাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরী। জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখ।
তালিকায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে জনবহুল নগর জাকার্তায় (২০২৫ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত) মোট ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষ বসবাস করছিল। ২০০০ সালে নগরটিতে মানুষ ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ।
তবে প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৫০ সালে সবচেয়ে জনবহুল নগরের বৈশ্বিক তালিকায় জাকার্তা আবারও দ্বিতীয় স্থানে নেমে যাবে। ওই সময় নগরটির জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ১৮ লাখ। তাকে ছাড়িয়ে প্রথম স্থানে উঠে আসবে ঢাকা।
অন্যদিকে ২০০০ সালে টোকিওর জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৩ লাখ। তখন বিশ্বের জনবহুল নগরগুলোর তালিকায় জাপানের রাজধানী ছিল ১ নম্বরে। ২৫ বছর পরে এসে নগরটির জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩৪ লাখে। বৈশ্বিক তালিকায় টোকিও তাই এখন ৩ নম্বরে।
কেন এই অবস্থা
জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট এ ঢাকাকে কী বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব? সম্ভব হলে উপায় কী, এই প্রশ্ন ছিল ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের কাছে।
তিনি বলেন, “আমাদের স্বাধীনতা বলেন, আর ২৪-এর আন্দোলনই বলেন, আমাদের তো একটা বৈষম্যহীন উন্নয়নই আমাদের দাবি। তাহলে আমাদের কেন চট্টগ্রাম আর ঢাকার বাইরে রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল—এইসব বিভাগগুলোতে কাজের সুযোগ থাকবে না? ওইগুলোতে কেন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে না?
“কেন সবাইকে আপনার ভালো স্কুল বলেন, বড় চাকরি— কেন ঢাকায় আসতে হবে? এটা তো উন্নয়নটাকে এত বৈষম্য করে রেখছে। এটা আসলে আর বাংলাদেশ সামাল দিতে পারছে না।”
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “একের পর এক সরকার যাচ্ছে, কিন্তু আসলে সেই একই রকম চিন্তাভাবনা নিয়েই চলছে । ইভেন, বড় কোনো পরিবর্তন নাই। আমাদের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে, যে আমাদের সরকার বিকেন্দ্রীকরণের জোর দিচ্ছে। বরং হচ্ছে যে, সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক।
“মন্ত্রণালয়গুলো, সরকারের দপ্তরগুলো, সবকিছু। এমন কি আপনি যদি দেখেন সাম্প্রতিক সময়ে, পূর্বাচল যে নতুন শহর, তার খুবই অল্প অংশ ছিল ঢাকায়। বাকিটা ছিল নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরে। পুরো পূর্বাচলকে আবার ঢাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার একটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। তাহলে পূর্বাচলের সবকিছু আবার ঢাকাকেন্দ্রিক হলো।”
তিনি বলেন, “এভাবে একের পর এক আসলে ঢাকাকেন্দ্রিকতার বাইরে, অন্যান্য যে বড় শহরগুলোতে অর্থনৈতিক এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো সম্প্রসারণ এবং ঢাকার মধ্যে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ দরকার। কিন্তু সরকারের এখানে নিয়ন্ত্রণের কোনো আগ্রহ নাই।
“বরং ব্যবসায়ীরা তো এখন বাংলাদেশে অনেক নীতি নিয়ন্ত্রণ করে; ব্যবসায়ীরা সব ঢাকাকেন্দ্রিক। বড় বড় করপোরেটরা ঢাকার বিভিন্ন জলাশয়, জলাভূমি, কৃষিজমি—সেগুলো দখল করে করে তাদের ব্যবসা বড় করছে। আর সরকারও এটা করতে দিচ্ছে। যার ফলে বড় আকারে ঢাকা থেকে বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত কিছুই দেখা যাচ্ছে না।”
উত্তরণের উপায় কী
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় কী জানতে চাইলে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “সবার আগে ঢাকার মধ্যে নতুন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিতে হবে। ঢাকা ইতোমধ্যে শিল্প এবং বাণিজ্যের ভারে ভারাক্রান্ত।”
তার পরামর্শ, “ঢাকা থেকে যেগুলো নিয়ম বহির্ভূত, বিশেষ করে যেই শিল্পগুলো ঢাকার বিভিন্ন জায়গাতে পরিবেশ দূষণের কারণ এবং যেগুলো ঢাকার থাকার কথা না, সেগুলো ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটা সময় বেঁধে দিতে হবে। আর নতুন কোনো কিছুর অনুমতি দেওয়া যাবে না।
“সেই সঙ্গে অন্য এলাকাতে শিল্প-কারখানা করার ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া, গ্যাস-ইলেকট্রিসিটির ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া, যেন সেইসব এলাকাতে ভালো মানের স্কুল এবং হাসপাতালও হয়। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এই অংশটা— সেটা যেন প্রসার করা হয়।”
এই নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, “এগুলো প্রসার করতে পারলে দেখা যাবে যে, মানুষ যখন দেখবে যে এখানে (ঢাকা) আর নতুন কিছু করা যাচ্ছে না, এখানে কাজের সুযোগ নেই নতুন, তখন তো মানুষ বাধ্য হয়েই বিকেন্দ্রীভূত হবে। মানুষ তো কাজের জন্যই আসে ঢাকায় মূলত।
“এরপর নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর দিতে হবে। সরকারকে এক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের কিছু বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, অধিদপ্তর— কৃষি খামার থেকে শুরু করে কৃষি, মৎস্য বা উপকূলীয় রক্ষী বাহিনী, এগুলোকে সরিয়ে ফেলতে হবে ঢাকা থেকে।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি পথ দেখায়, আর ব্যবসায়ীদেরকে এই বার্তাটা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, আপনারা ঢাকায় আর কোনো নতুন জায়গা পাবেন না, আপনারাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আপনাদের যেতে হবে, যদি ব্যবসা করতে চান; তাহলে আস্তে আস্তে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। এটা অসম্ভব কিছু না, কিন্তু এজন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাটা খুবই দরকার।”
সমান ভাবে উন্নয়ন না ঘটালে থামবে না ঢাকামুখী স্রোত
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের একজন নাগরিককে কেন ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকা যেতে হবে? কেন সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় বাসা ভাড়া নিতে হবে? কেন একটি ব্যবসা বড় করতে হলে ঢাকায় অফিস খুলতে হবে? কেন ন্যায়বিচার কিংবা সরকারি সেবা পেতে রাজধানীর দ্বারস্থ হতে হবে?
যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার, প্রশাসন, শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে ছড়িয়ে না দেওয়া হবে, ততদিন ঢাকার দিকে মানুষের এই স্রোত থামবে না। আর সেই স্রোতের ভার বহন করতে করতে ঢাকা আরও বেশি বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নতুন সেতু বা উড়ালসড়ক নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে সাফল্যের জন্য একজন নাগরিককে রাজধানীমুখী হতে বাধ্য হতে হবে না।
মন্তব্য করুন

