হামে প্রায় ৬০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত
শিশুদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে যে প্রশ্ন
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
বাংলাদেশে হামের পরিস্থিতি এখন আর শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়, এটিকে জনস্বাস্থ্যের বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ১ জুন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫৮৮ জন। এর মধ্যে ৯০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত করা গেছে। বাকিদের ক্ষেত্রেও উপসর্গ ছিল একই রকম, কিন্তু পরীক্ষা না হওয়া বা পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তাদের সবাইকে আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে আনা যায়নি। এই সময়ে ৬৩ হাজারের বেশি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে আট হাজারের কাছাকাছি। আর যে তথ্যটি সবচেয়ে বেশি বেদনাদায়ক, তা হলো আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ রোগটি সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে তাদের, যারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য পুরোপুরি বড়দের ওপর নির্ভরশীল।
রোগটি ইতোমধ্যে ৬৪টি জলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এটাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবু আমাদের আলোচনায় বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, ততটা পাচ্ছে কি? কেন এখনো এমন শিশু আছে যারা নিয়মিত টিকার আওতায় আসেনি? কেন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ এত বড় আকার নিল? ৫৮৮ মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর মানে শত শত পরিবার এমন এক শূন্যতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যা কোনো পরিসংখ্যান বোঝাতে পারে না। আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় মৃত্যুর সংখ্যাটি শুনে বিচলিত হই, তারপর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই। অথচ অভ্যস্ত হওয়ার মতো কিছু এখানে নেই। একটি শিশুরও যদি প্রতিরোধযোগ্য কারণে মৃত্যু হয়, সেটি আমাদের সবাইকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।
একটা সময় বাংলাদেশকে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে আমরা গর্ব করতাম। সত্যি বলতে কী, সেই গর্বের যথেষ্ট কারণও ছিল। হাম-রুবেলা টিকার কারণে বহু বছর ধরে এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছিল। তাই আজ যখন আবার হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, শত শত শিশু মারা যাচ্ছে, তখন শুধু উদ্বেগ নয়—এক ধরনের হতাশাও কাজ করে। মনে হয়, আমরা কি তবে কোথাও ভুল পথে হেঁটেছি? সাম্প্রতিক এই বিস্ফোরণ প্রমাণ করেছে—স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামান্য দুর্বলতাও কত দ্রুত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, নিয়মিত টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ায় দেশে “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যার ফলে এই মহামারী বিস্তার লাভ করেছে।
আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লাগে, হামকে এখনো অনেকে এমনভাবে দেখে যেন এটি খুব সাধারণ একটি শিশু রোগ। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি এতটাই সংক্রামক যে একজন আক্রান্ত শিশু থেকে আরও ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। শুরুটা হয়তো জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি দিয়ে। তারপর কখনো নিউমোনিয়া, কখনো তীব্র ডায়রিয়া, কখনো আরও জটিল সমস্যা। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই লড়াইটা করতে হচ্ছে সবচেয়ে ছোটদের। যে শিশুর কিনা স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা, পৃথিবীটাকে একটু একটু করে চিনে নেওয়ার কথা, সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। আমি জানি, সব সংকটকে আবেগ দিয়ে বিচার করা যায় না। কিন্তু এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়ালে পরিসংখ্যানের ভাষা খুব দ্রুতই অর্থহীন হয়ে যায়।
আরেকটা কথা বলতেই হয়। হাম কোনো নতুন রোগ নয়। এর টিকাও নতুন নয়। তাই যখন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবার এত বড় আকারে ফিরে আসে, তখন শুধু ভাইরাসকে দোষ দিয়ে দায় শেষ করা যায় না। সেখানে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নীতিনির্ধারণ, টিকাদান কার্যক্রম এবং সামাজিক উদাসীনতা—সবকিছুর দিকেই তাকাতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত মূল্যটা দিচ্ছে শিশুরাই।
এখন প্রশ্ন হলো— কোথায় ভেঙে পড়েছে ব্যবস্থা? এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের ব্যর্থতা কতটুকু? এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। একটি মহামারীর পেছনে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক কারণ থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়ও এড়ানো যায় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা যথাসময়ে শনাক্ত ও পূরণ করা যায়নি। দেশজুড়ে এই যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ল তার অন্যতম কয়েকটি কারণ হল—টিকাদান সরবরাহ বিপর্যয়, গণটিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়া, স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির সংকেত উপেক্ষা।
টিকাদান সরবরাহ বিপর্যয়— অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায এবং টিকার সরবরাহ ফুরিয়ে আসে। এতে দেশজুড়ে টিকার অভাব দেখা দেয়। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে; এই তথ্য পরে সরকারি ওয়েবসইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
গণটিকাদান কর্মসূচি বন্ধ— হাম-রুবেলার যে গণটিকাদান কর্মসূচি সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজন করা হয়, তা এবার হয়নি। সবশেষ কর্মসূচি ২০২০ সালে বস্তবায়িত হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান কর্মসূচিটিও বাতিল করা হয়।
স্বাস্থ্যকর্মী সংকট— ২০২৫ সালে অর্ধেকের বেশি জেলায় ৪৫ শতাংশ পদ শূন্য ছিল এবং কর্মরত কর্মীদের চলমান ধর্মঘট পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছিল।
রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব— ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা — ধর্মঘট, গণবিক্ষোভ স্বাভাবিক টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত করেছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির সংকেত উপেক্ষা— ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রভাব এবং এই রোগ সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি শনাক্ত করতে নীতিনির্ধারকেরা ব্যর্থ হয়েছেন।
দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোও বলছে, টিকা সরবরাহে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এছাড়া দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও ব্যর্থতা আছে। এখনো বহু অভিভাবক টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভয় পোষণ করেন। কোথাও ধর্মীয় গুজব, কোথাও সামাজিক অবহেলা, কোথাও দারিদ্র্য—এসব কারণে শিশুরা টিকাবঞ্চিত থেকে যায়। শহরের বস্তি, দুর্গম চরাঞ্চল বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অনেকেই স্বাস্থ্যসেবার বাইরে। ফলে হামের মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বিগত সরকারের বর্থতায় শিশুদের নিয়মিত টিকা না দেওয়ার কারণেই দেশে হামের এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন দায় শুধু অতীত সরকারের একার নয় — বর্তমান সরকারও প্রাথমিক সংকেত উপেক্ষা করেছে এবং সময়মতো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। ইউনিসেফের মিগেল মাতেওস মুনোজ বলেছেন, “গত বছর সরকার টিকার সরবরাহ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল, যা টিকা সরবরাহে বিলম্বের কারণ। যার ফলে উদ্বেগজনক সংখ্যক শিশু আংশিক বা কোনো টিকাই পায়নি।” ইতোমধ্যে দেশে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, রোগ নজরদারি বৃদ্ধি এবং ভিটামিন-এ বিতরণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি যথেষ্ট? সম্ভবত না। কারণ হাম শুধু চিকিৎসা দিয়ে থামানো যায় না, এটি একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়েই হাম ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ—সবখানেই টিকা কভারেজ কমে যাওয়ায় সংক্রমণ বেড়েছে। WHO-এর মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এই হার সামান্য কমলেই ভাইরাস দ্রুত ফিরে আসে। বিশ্বের নানা দেশ বিভিন্ন সময়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। সেসব দেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আফ্রিকার বহু দেশে “ডোর-টু-ডোর ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন” চালু করা হয়েছে। ভারত ব্যাপক গণটিকাদান কর্মসূচি এবং স্কুলভিত্তিক টিকা কার্যক্রম জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ বাড়লে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়, আক্রান্ত এলাকায় স্কুল পর্যবেক্ষণ বাড়ানো হয় এবং দ্রুত আইসোলেশন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইউরোপের কিছু দেশে ডিজিটাল ভ্যাকসিন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যাতে কোনো শিশুকে টিকা দেওয়া না হলে, তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এখানে হাম মহামারীতে আক্রান্ত কয়েকটি দেশের উল্লেখ করা হল। সেইসব দেশের হাম প্রতিরোধে প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সামোয়া (২০১৯) — সামোয়ার প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত। সামোয়ায় টিকার প্রথম ডোজ মাত্র ৪০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ মাত্র ২৮ শতাংশ শিশু পেয়েছিল — যা ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন হারের কারণ ছিল একটি মর্মান্তিক ঘটনা: ভুলভাবে তৈরি টিকা দেওয়ায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়, যা ৮ মাসের জন্য জাতীয় টিকা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে সামোয়ার সরকার ১৫ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং অগ্রাধিকার গোষ্ঠীর জন্য টিকাদান বাধ্যতামূলক করে। জরুরি অবস্থা চলাকালে স্কুল বন্ধ, শিশুদের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা, নিবিড় টিকাদান অভিযান, কারফিউ এবং হাসপাতালের রিসোর্স পুনর্বিন্যাস করা হয়। বিশ্বের ১৮টি দেশ থেকে জরুরি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়, যেখানে ৫৫০-এরও বেশি চিকিৎসাকর্মী, টিকা বিশেষজ্ঞ ও লজিস্টিক্স কর্মী ছিলেন। দ্রুত টিকাদান অভিযানের ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৯৩ শতাংশ সামোয়ান নাগরিককে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়।
ইউক্রেন (২০১৭–২০১৯) — ইউক্রেনে ১ লাখেরও বেশি হামের রোগী ধরা পড়ে এবং ৩৩ জন মারা যায়। প্রতিক্রিয়ায় একটি জাতীয় হাম রেসপন্স কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সব অংশীদারদের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬টি অঞ্চলে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য বিশেষ ক্যাচ-আপ টিকাদান অভিযান শুরু হয়। WHO-এর সহায়তায় সরকার একটি জাতীয় হাম টাস্কফোর্স তৈরি করে, মানসম্পন্ন টিকার দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী সকল শিশুর টিকাদান সম্প্রসারিত করে। স্কুলে প্রতিটি শিশুর টিকার সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে ২০১৭ সালে সময়মতো টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়।
কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (DRC, ২০১৯) — DRC-তে ২০১৯ সালে ৩ লাখের বেশি সন্দেহজনক কেস এবং ৬ হাজারেরও বেশি মৃত্যু রেকর্ড করা হয় — যা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারীগুলোর একটি। WHO ও অংশীদার সংস্থাগুলো ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়। প্রত্যন্ত বনাঞ্চলে পৌঁছাতে মোটরসাইকেল ও মোটরচালিত নৌকা ব্যবহার করা হয়, কারণ ভ্যাকসিন ঠান্ডায় রাখতে হয় বলে পায়ে হেঁটে পরিবহন সম্ভব ছিল না। WHO ৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও নজরদারির জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়।
বলিভিয়া (২০২৫–২০২৬) — বলিভিয়া সাম্প্রতিক উদাহরণ। বলিভিয়ায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে সান্তা ক্রুজে প্রাদুর্ভাব শুরু হলে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। ১ থেকে ৪ বছর বয়সীদের দুই ডোজ MMR টিকা দেওয়া হয় এবং ৫ থেকে ২০ বছর বয়সীদের জন্য গণটিকাদান অভিযান চালানো হয় — মোট ১০ লাখেরও বেশি ডোজ দেওয়া হয়। শহর, গ্রামীণ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ে মোবাইল ব্রিগেড পাঠানো হয় এবং স্কুল ও জনপরিসরকে টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত অন্য দেশগুলোর একটা বড় পার্থক্য চোখে পড়ে। তারা পরিস্থিতি খারাপ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি। কোথাও জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে, কোথাও আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার পুরো ব্যবস্থাকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা সেই গতিটা দেখাতে পারিনি। কয়েক সপ্তাহের দেরি শুনতে খুব বড় কিছু মনে নাও হতে পারে, কিন্তু সংক্রামক রোগ সময়কে অন্যভাবে মাপে। সেখানে কয়েক সপ্তাহ মানে কখনো কখনো হাজার হাজার নতুন সংক্রমণ।
এখন আর বিতর্কের সময় নেই। টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—শিশুর স্বাস্থ্য কোনো রাজনৈতিক তর্কের বিষয় হতে পারে না। সরকার বদলাবে, নীতি বদলাবে, কর্মকর্তা বদলাবেন; কিন্তু শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে ধারাবাহিকতা না থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত জাতিকেই দিতে হয়। হামের এই বিস্তার আসলে আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের সমস্যা এমনই—এটা হঠাৎ ভেঙে পড়ে না। বছরের পর বছর ছোট ছোট দুর্বলতা জমতে জমতে একসময় বড় সংকটে রূপ নেয়। তখন আর ক্ষতির হিসাব শুধু সংখ্যায় ধরা যায় না। অনেক সময় আমরা মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কথা বলি, পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলি। কিন্তু সংখ্যা মানুষকে পুরো গল্পটা বলে না। আজ যে শিশুটি হামে মারা যাচ্ছে, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়—এই কথাটা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু কথাটার ভেতরে যে কত বড় বেদনা আছে, তা বোঝা যায় হাসপাতালের করিডোরে। হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকা একজন মায়ের কাছে তার সন্তান কোনো পরিসংখ্যান নয়। একজন মা যখন সন্তানের নিথর শরীর বুকে নিয়ে বসে থাকেন, তখন সেই দৃশ্যকে শুধু ব্যক্তিগত শোক বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটি রাষ্ট্রকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সেখানে রাষ্ট্রেরও একটা ব্যর্থতা, সমাজেরও একটা দায় থেকে যায়। কারণ এমন অনেক মৃত্যু আছে, যা হয়তো প্রতিরোধ করা যেত।
এখনও সময় আছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার। তবে তার জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দরকার। কারণ হামের বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু একটি ভাইরাসকে থামানোর লড়াই নয়। এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, প্রশাসন কতটা কার্যকর, আর আমরা শিশুদের জীবনকে সত্যিই কতটা মূল্য দিই—তারও পরীক্ষা।
মন্তব্য করুন

