Logo

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

শুধু কি একটি সিনেমা, নাকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই আঘাত?

কাভার স্টোরি

বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধ

শুধু কি একটি সিনেমা, নাকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই আঘাত?

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

গত শতকের ৮০ দশকের প্রথম ভাগ। তখনও বিদ্যুৎ সরবরাহ শহরের বাইরে গ্রামগুলোতে গিয়ে পৌঁছেনি। কিশোরগঞ্জের যশোদল ইউনিয়নের দানাপাটুলী গ্রামের অবস্থাও ছিল বিদ্যুৎবিহীন। এশার নামাজের পরেই গ্রামগুলো ঘুমিয়ে যেত। সেই গ্রামের ছেলে জামাল উদ্দিন; যিনি একটি সরকারি অফিসে পিয়নের চাকরি করতেন। বাড়ি থেকে অফিসে যাতায়াতের বাহন ছিল বাইসাইকেল। সেই সাইকেলে চড়তে দেওয়া তো দূরে থাক কাউকে হাতও দিতে দিতেন না। কিন্তু, শহরের হলে নতুন সিনেমা এলেই ছেলে-মেয়েদের ঘুম পারিয়ে সেই সাইকেলে রডে বা ক্যারিয়ারে বউকে চাপিয়ে রওনা হতেন ‘নাইট শো’ দেখতে। শহরে তখন তিনটি সিনেমা হল—রঙমহল, মানসী এবং ইউনিভার্সেল। এগুলোই ছিল সেই সময়ের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। আর সারা দিনের কাজ শেষে জামাল উদ্দিন সম্পতিরা নাইটশো সিনেমা দেখতে গিয়ে কোনো হুমকি-ধামকির শিকার হয়েছেন তেমনটা শোনা যায়নি। আর এখন…? 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সিনেমা প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট স্থানীয় বিরোধ বলে মনে হলেও এর ভেতরে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনের ভূমিকা এবং ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব। জন্ম দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন।

সিনেমাটি দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে, বিদেশেও প্রদর্শিত হচ্ছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমোদিত একটি চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার প্রদর্শনী হুমকি দিয়ে বন্ধ কারে দেওয়া বিশেষ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে বইকি। 

কীভাবে শুরু হলো বিতর্ক?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ঈদুল আজহা উপলক্ষে স্থানীয় অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছিল। এর আগে দেশী-বিদেশি বহু চলচ্চিত্র তারা প্রদর্শন করেছে।

কিন্তু প্রদর্শনীর ঘোষণা দেওয়ার পরপরই জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের কয়েকজন নেতা ও কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরোধিতা শুরু করেন। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তারা সিনেমাটিকে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘ধর্মীয় পরিবেশবিরোধী কার্যক্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রদর্শনীর পোস্টারে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানানো হয়।

এরপর দ্রুত পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় আলেমরা জরুরি বৈঠক করে প্রদর্শনী প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিরও ঘোষণা দেয় তারা। অবশেষে, প্রদর্শনী স্থগিত করার ঘোষণা আসে।

প্রশ্নের কেন্দ্রে ‘অশ্লীলতা’ অভিযোগ

পুরো ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রদর্শনী বন্ধের পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন, তারা মূলত ‘অশ্লীলতা’ এবং ‘ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষার’ যুক্তি সামনে এনেছেন। অথচ, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে দেশব্যাপী কোথাও অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠেনি। এটি পরিবারসহ দেখার উপযোগী একটি সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে, একটি চলচ্চিত্র অশ্লীল কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর, নাকি কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর? বাংলাদেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড রয়েছে। কোনো চলচ্চিত্র সেই বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার পর সেটিকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে প্রদর্শন বন্ধ করার দাবি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

প্রশাসনের ভূমিকা: নিরপেক্ষতা নাকি নীরব সমর্থন?

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনের ভূমিকা। আয়োজকদের অভিযোগ, তারা প্রশাসনের কাছ থেকে কার্যকর সহায়তা পাননি। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমতির আবেদন তাদের কাছে আসেনি। তবে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা হলো—একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়নি।

সমালোচকদের মতে, যদি কোনো গোষ্ঠী সামাজিক মাধ্যমে আপত্তি তোলে এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখায়, আর তার ফল হিসেবে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। কারণ এতে বার্তা যায় যে সংগঠিত চাপ সৃষ্টি করতে পারলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করানো সম্ভব। তাইতো সংস্কৃতিক অঙ্গন এবং সাধারণেরও প্রশ্ন—প্রশাসনের দায়িত্ব কি অনুষ্ঠান বাতিল করা, নাকি আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে দেওয়া?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা

এই ঘটনার আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাস। একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগীতচর্চার কেন্দ্র। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আলী আকবর খাঁ, অন্নপূর্ণা দেবী, আয়েত আলী খাঁসহ অসংখ্য সংগীতসাধকের জন্ম এই অঞ্চলে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এই জেলার। কিন্তু গত এক দশকে জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সঙ্গীতাঙ্গন, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে, বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়াকে কোনো ভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার একটি ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গণের মানুষেরা।

উদ্বিগ্ন চলচ্চিত্র অঙ্গন

ঘটনাটিকে ঘিরে নির্মাতা তানিম নূর, রেদওয়ান রনি, আশফাক নিপুনসহ অনেক চলচ্চিত্রকর্মী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের যুক্তি, ক্ষতিটি কেবল একটি চলচ্চিত্রের নয়। আজ যদি একটি জনপ্রিয় ও সেন্সর-অনুমোদিত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়, কাল অন্য চলচ্চিত্র, নাটক, বইমেলা, সঙ্গীতানুষ্ঠান কিংবা শিল্পপ্রদর্শনীর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ (বিএফএফএস) এবং চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপও তাদের বিবৃতিতে বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, কোনো শিল্পকর্ম নিয়ে আপত্তি থাকলে সমালোচনা, বিতর্ক বা বয়কটের পথ খোলা আছে। কিন্তু হুমকি, চাপ কিংবা সম্ভাব্য মব তৈরির আশঙ্কায় প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নির্মাতা তানিম নূরের প্রশ্ন

ঘটনার পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে বনলতা এক্সপ্রেসের নির্মাতা তানিম নূরের কাছ থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াই তাঁর পৈতৃক নিবাস। ফলে ঘটনাটি তাঁর কাছে কেবল একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার বিষয় ছিল না, বরং নিজ শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়েও এক ধরনের হতাশার কারণ হয়ে দেখা দেয়।

তানিম নূর বলেন, ‘বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া একটি চলচ্চিত্র দেশের যেকোনো জায়গায় প্রদর্শন করা যাবে। কেউ যদি সেই চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করার কথা বলে, তাহলে তা আইনবহির্ভূত।’

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, একটি বৈধ চলচ্চিত্রের পোস্টারে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে প্রচারণা চালানো এবং উগ্রবাদী ভাষা ব্যবহার করার অধিকার কোনো গোষ্ঠীর আছে কি না। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রবণতা শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করে।

চলচ্চিত্র অঙ্গনের উদ্বেগ

ঘটনার পরপরই দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্মাতা রেদওয়ান রনি এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আজ এটাকে ছোট ঘটনা মনে হলেও ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শো মাস্ট গো অন।’

নির্মাতা আশফাক নিপুন বিষয়টিকে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ক্ষতিটা বনলতা এক্সপ্রেসের নয়। ক্ষতিটা মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চার। একটি সরকার যদি নিজেকে সংস্কৃতিবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে যে কেউ যখন যা ইচ্ছা বন্ধ করে দেওয়ার সংস্কৃতিকে আইনগতভাবে দমন করতে হবে।’

নিপুনের মতে, আজ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হলে আগামীকাল কম পরিচিত কোনো চলচ্চিত্র, নাটক বা শিল্পকর্মের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। 

সুরের রাজধানী থেকে সাংস্কৃতিক সংকোচনের প্রতীক

লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আহমাদ ইশতিয়াক সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার একটি তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই জেলাতেই জন্ম নিয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আলী আকবর খাঁ, অন্নপূর্ণা দেবী, আয়েত আলী খাঁ, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, কবীর চৌধুরীর মতো সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বরা। ইশতিয়াকের বক্তব্যে ফিরে আসে ২০১৬ ও ২০২১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সঙ্গীতাঙ্গন, পাঠাগার, জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও। তাঁর মতে, বনলতা এক্সপ্রেস বিতর্ককে সেই ধারাবাহিকতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কাল পুরো বাংলাদেশ

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক সাহাদ আমিন ঘটনাটিকে একটি বৃহত্তর প্রবণতার সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনানুষ্ঠানিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ হওয়া কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অনানুষ্ঠানিকভাবে সিনেমা দেখানো বন্ধ হলো। পরবর্তীতে অন্য কোনো জেলায় হবে। এরপর ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশে।’ তাঁর মতে, এর মোকাবিলায় প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ, যেখানে মানুষকে ভাবতে শেখানো হবে, প্রশ্ন করতে শেখানো হবে এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক সংহতি জোরদার করা হবে। 

চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সতর্কবার্তা

ঘটনার পর বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ (বিএফএফএস) এক বিবৃতিতে এটিকে ‘প্রগতিবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করে। সংগঠনটির ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি এবং সম্ভাব্য মব সৃষ্টির আশঙ্কার মুখে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য বিপজ্জনক নজির। তাদের মতে, প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রদর্শনী সম্পন্ন হতে দেওয়া। অন্যথায় ভবিষ্যতে যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন সংগঠিত চাপের মুখে পড়ে যেতে পারে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ’। সংগঠনটির মতে, কোনো চলচ্চিত্রের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ভীতি সৃষ্টি এবং প্রদর্শনী বন্ধ করার চেষ্টা সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপের বিপজ্জনক উদাহরণ।

প্রদর্শনী চেয়েও বড় প্রশ্ন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বৈধ কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে? সাংস্কৃতিক কর্মী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন ও সাংবিধানিক কাঠামো; নাকি সংগঠিত মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই সীমাহীন নয়। কিন্তু সেই সীমা নির্ধারণের দায়িত্বও ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত নয়; বরং আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার।এই কারণেই বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী স্থগিত হওয়ার ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন বাতিল হওয়ার খবর নয়। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় কারও ধর্মীয় অনুভূতি, কারও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং কারও রাজনৈতিক অবস্থান জড়িয়ে গেছে। কিন্তু বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন রয়ে যায়—আইনসম্মত একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন কি কেবল সংগঠিত আপত্তির মুখে বন্ধ হয়ে যেতে পারে?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো চলচ্চিত্র, নাটক, বইমেলা— কোনো শিল্প-আয়োজনই নিরাপদ থাকবে না। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আইনের শাসন, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শণী বন্ধ সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন লক্ষ্য কি কেবল ‘বনলতা এক্সপ্রেস’? নাকি—বাংলাদেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ধারা? রাষ্ট্র কি তার আইনী কাঠমো, নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে সেই মৌলবাদী সংগঠিত গোষ্ঠী ও ভয়ের রাজনীতির দিকে হেলে পরছে না?

মন্তব্য করুন

Logo