Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

ন্যায্য হিস্যা ও সম্মানজনক সহাবস্থানের ইশতেহার

ফারাক্কা প্রশ্নে মওলানা ভাসানির অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী

কাভার স্টোরি

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর

ন্যায্য হিস্যা ও সম্মানজনক সহাবস্থানের ইশতেহার

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৬ মে এক অনন্য দিন। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। এটি কেবল মাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; ছিল নদী, প্রকৃতি, কৃষি, মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় অধিকার রক্ষার এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ। ঐতিহাসিক সেই গণজাগরণ লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তি আজ। অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও ফারাক্কা প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বরং জলবায়ু সংকট, নদীর শুকিয়ে যাওয়া, কৃষি বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছে। 
ফারাক্কা লংমার্চ ছিল একদিকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভাসানী কেবল একটি বাঁধের বিরোধিতা করেননি; তিনি সতর্ক করেছিলেন আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে, যেখানে বড় রাষ্ট্র ছোট প্রতিবেশীর প্রাকৃতিক অধিকারকে উপেক্ষা করে।

ফারাক্কা বাঁধ: নির্মাণ ও বিরোধের ইতিহাস
ভারত গঙ্গা নদীর ওপর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা এলাকায় বাঁধ নির্মাণ শুরু করে ১৯৬১ সালে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং হুগলী নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানো। কিন্তু এই প্রকল্পের শুরু থেকেই পূর্ব-পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, গঙ্গার উজানে পানি প্রত্যাহার করলে ভাটির অঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হলে বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে থাকে। পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যায়, শুকিয়ে যেতে শুরু করে অসংখ্য শাখানদী। উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নৌপরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লবণাক্ততা বাড়তে থাকে উপকূলীয় অঞ্চলে। নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার পর সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ভাসানী বিষয়টিকে কেবল কূটনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে জনগণের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন।



ভাসানীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
মওলানা ভাসানী ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী গণনেতা। তিনি ছিলেন কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আসামের কৃষক বিদ্রোহ, পাকিস্তানি শোষণবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন গণমানুষের পক্ষে এক আপসহীন নেতা।
ফারাক্কা প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নদী ও পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে। সেই কারণেই তিনি নদীকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, জনগণের জীবন ও সার্বভৌম অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ, ‘পিন্ডির জিঞ্জির ছিন্ন করেছি, দিল্লির দাসত্ব করতে নয়’—ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার ঘোষণা। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও যদি তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে সেই স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ হয় না।

লংমার্চ: এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ
১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে এটি পরিণত হয় এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যোগ দেন।
লংমার্চটি রাজশাহী থেকে গোদাগাড়ী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত পৌঁছায়। পথে পথে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন। মহানন্দা নদী পার হওয়ার জন্য মানুষ নিজেরাই নৌকা দিয়ে অস্থায়ী সেতু তৈরি করেন। এই দৃশ্য ছিল জনগণের ঐক্য ও সংকল্পের এক বিরল উদাহরণ।
কানসাটে সমাবেশে ভাসানী তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ফারাক্কা বাঁধকে ‘মরণ বাঁধ’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বাঁধ বাংলাদেশের নদী, কৃষি ও মানুষের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। আজকের বাস্তাবতা তাঁর আশঙ্কাই সত্য প্রমাণ করেছে।

নদী ও জনজীবনের সংকট
ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী নাব্য হারায়। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেচের পানির সংকট তৈরি হয়। নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি ও সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে মৎস্যসম্পদ কমে যাচ্ছে, সংকটে পড়েছে জেলেদের জীবন-জীবিকা।
বাংলাদেশের নদীগুলো আন্তঃসংযুক্ত। গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গেলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু নদীতে। ফলে এটি কেবল একটি নদীর সমস্যা নয়; বরং পুরো নদী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব, অন্যদিকে বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা—এই দুই চরম বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হচ্ছে।



গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা
আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনে ‘ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যবহার’ একটি স্বীকৃত নীতি। উজানের রাষ্ট্র একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে ভাটির রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চুক্তিতেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছরের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে বাস্তবে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত পরিমাণ পানি কখনই পায় না। নদীর প্রকৃত প্রবাহ প্রত্যাহর, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-বরাকের উজানে নতুন নতুন প্রকল্পের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এ বছর সেই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিরও মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকাও দুই দেশের পানি কূটনীতিতে অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে আছে। ফলে ফারাক্কা প্রশ্ন এখন আর কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও বাস্তব সংকট।

সহযোগিতা ও সংশয়ের দ্বৈত বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধন, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক তাৎপর্যপূণ। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, রেল ও নৌযোগাযোগ বেড়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, ভিসা, সীমান্তে দিয়ে ভিন্ন মতবলম্বী ভারতীয় নাগরিককে জোর করে ঠেলে পাঠানো ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে শীতল অবস্থায় নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে, সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, জাতীয় স্বার্থ ও ন্যায্য অধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের আরও দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন। ফারাক্কা ও তিস্তার মতো ইস্যুগুলোতে সেই প্রত্যাশা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভারতের সঙ্গেও বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ফারাক্কা লংমার্চের অন্যতম শিক্ষা এখানেই—প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়।

নদী ও পরিবেশ রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
বিশ্বজুড়ে এখন পানি ও নদীকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের ভূ-রাজনীতি তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পানির ওপর চাপ বাড়ছে।
বাড়ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। চীন, ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ—সব দেশই নদীর পানিকে উন্নয়ন ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আরও দক্ষ পানি কূটনীতি গড়ে তুলতে হবে। নদী গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তি আমাদের সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়।



এবং কিছু অমিমাংশিত প্রশ্ন
ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তি আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমরা কি আমাদের নদীগুলো রক্ষা করতে পেরেছি? আমরা কি আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য অধিকার আদায়ে যথেষ্ট কার্যকর কূটনীতি গড়ে তুলতে পেরেছি? উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছি কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ফারাক্কা লংমার্চ বাংলাদেশের জনগণের অধিকার সচেতনতা ও প্রতিবাদী চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি ছিল এমন এক আন্দোলন, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশ, কৃষি, নদী ও মানুষের জীবন একই সুতোয় গাঁথা হয়েছিল।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে পানি নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, তখন ফারাক্কা লংমার্চের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। শক্তির কাছে নতি স্বীকার নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে সংগঠিত করার যে রাজনৈতিক দর্শন ভাসানী দেখিয়েছিলেন, সেটিই আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।ফারাক্কা লংমার্চ তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের নদীমাতৃক অস্তিত্ব রক্ষার চলমান সংগ্রামের প্রতীক।

মন্তব্য করুন

Logo