হাওরে ভেসে যাচ্ছে কৃষকের ফসল, দায় কার?
হাওরে ঢলে পড়া কৃষক, ধান ও মাছের দোহাই
পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১২:৩৩ এএম
দেশের একেক হাওরে জমির মাপ একেক রকম। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরে জমির মাপ হয় কেদারে। এক কেদার মানে ৩০ শতক জমি। চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের ভুরাখালি গ্রামের কৃষক সুলতান মিয়া চলতি বোরো মওসুমে বর্গা আর ঋণ-কর্জ করে চাষ করেছিলেন ১২ কেদার জমি। সব তলিয়েছে, এক ছটাক ধানও ঘরে আনতে পারেননি। আলাপকালে সুলতান মিয়া জানান, ‘...কিলান কিতা করতাম কুনু কুল পাইরাম না, খালি উগাড় আর মনো অয় এই জীবনে ভরতো নায়। হায়রে আমরার দুক্ক কই গিয়া কইতাম?’’
সুলতান মিয়াদের উগাড় (গোলাঘর) শূণ্য থাকলেও প্রতিবছর জীবনবাজি রেখে হাওরের এই কৃষকেরাই নিশ্চিত করেন দেশ ও দশের ভাতের থালা। জাতীয় খাদ্যভান্ডে প্রতি বছর ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান জমা দেয় হাওরাঞ্চল। কেবল ধান নয়, হাওর আমাদের দেশি মাছ কী গরুর বৈচিত্র্য এবং উপহার দিয়েয়ে অবিস্মরণীয় গানের ভান্ড। দেশের অন্যতম বৃহৎ বিরল এই প্রাকৃতিক বাস্ততন্ত্র এবং জীবনধারার প্রতি রাষ্ট্র বরাবরই কলোনিয়াল এবং বৈষম্যমূলক। প্রতি বছর বোরো মওসুমে ধান কাটার আগে হাওর তলিয়ে যাওয়া কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার চাপ নয়। হাওরবিরোধী উন্নয়নের বিরূপ ফলাফল। কেবল কৃষক নয়; হাওরের মাটি, জলা, মাছ, ধান সবাইকে এই দু:সহ যন্ত্রণাকে ঘাড়ে চাপাতে হয়েছে। রাষ্ট্র নিরুত্তর। রাষ্ট্র হাওরে অন্যায় ইজারা বাণিজ্য চালু রেখেছে। মাছেদের বসতি বন্ধক দিয়েছে লুটেরাদের জিম্মায়। গভীর পানির ধানের জন্মমাটিতে বৈধতা দিয়েছে বিনাশী হাইব্রিড বীজের বাজার। আর এইসব নাম্বারঅলা উফশী আর হাইব্রিড ধানজাত গুলির জীবনিশক্তি এতই কম যে, সামান্য পানির ঢলেই কাহিল হয়ে যায়। এমনকি এসব জাতের সামাজিক সাংষ্কৃতিক শক্তিও নাই। রাষ্ট্রের খায়েশ হলো হাওরের জমি-জাঙ্গাল কেটে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে ‘কনট্রাক্টরি ব্যবসা’ করল। হাওরের জলপ্রবাহ খুন করে রাস্তা বানাল। উজানে চালু রাখলো এলাপাথারি খনন আর বনবিনাশ। হাওর এই ভূখন্ডের এক ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক ও সাংষ্কৃতিক শরীর। এই শরীর খাবলে কেবল মুনাফার কথাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শরীরের সুস্থতা অসুস্থতা নিয়ে রাষ্ট্র ভাবে নাই। তাই আমাদের সামনে একের পর এক হাওর তলায়। তলিয়ে যাওয়া হাওরে নিদারুণভাবে ঢলে পড়ে কৃষক, ধানের গোলা আর মাছেদের সংসার।
হাওরে ঢলে পড়া কৃষকের মৃত্যুর দায় নিতে হবে
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম। এখানকার দেশি গরুর দুধের পনির জগতবিখ্যাত। টেপী বোরোকেও কিশোরগঞ্জের জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র জিআই ধানের মর্যাদা রাখেনি, হাওরে প্রশ্নহীনভাবে বৈধ করেছে উফশী আর হাইব্রিড ধান আবাদ। অষ্টগ্রামের আলীনগর পশ্চিপাড়ার কৃষক আক্তার হোসেন প্রায় দেড় লাখ টাকা নিয়ে বোরো মওসুমে ধানের আবাদ করেছিলেন। জলাবদ্ধ-বন্যায় তলিয়ে গেছে হাওর। ধান হারিয়ে জমিতেই ঢলে পড়েন কৃষক। ২ মে ২০২৬ সন্ধ্যায় মারা যান। কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বোরো মওসুমে কিশোরগঞ্জে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর ধানের জমিন তলিয়েছে। কৃষিবিভাগের হিসাবে ইটনা, মিঠামইন, নিকলি ও অষ্টগ্রামের হাওরাঞ্চলের ১০ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় ৩৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর। নাসিরনগরের মেদির হাওয়ের আয়তন প্রায় ৮৯৬০ একর। রামপুর, লাখাইল, নোয়াগাঁও, গঙ্গানগর, আশুরাইল, নাছিরপুর, টেকানগর, পোয়ালনগর গ্রাম। মেদির হাওরের পূর্ব-দক্ষিণে লঙ্গন নদী দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। পশুশাইল, বাশফুল, লাখাই, গচি, বোরো, টেপি বোরো, বনজুর, খৈয়াবোরো, ব্রিধান-২৯, মঙ্গল আবাদ হয়। ২০০৫ থেকে হাওরে হাইব্রিড হীরা ধানের আবাদ শুরু হয়েছে।
চলতি বোরো মওসুমে নাসিরনগরে ১৭ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। গোয়ালনগর গ্রামের রামপুর গ্রামের কৃষক আহাদ মিয়া পুরনো কাপড় সংগ্রহ করে ফেরি করে বিক্রি করতেন। এক শতক জমিতে ভাঙা একটা ঘর আর মেদির হাওরে এক বিঘা জমি ছাড়া পরিবারটির আর কিছুই নাই। স্ত্রী অন্ত:স্বত্তা, ঘরে আরো তিন সন্তান। ৮০ হাজার টাকা ঋণ করে ৫ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে মোট ৬ বিঘাতে বোরো মওসুমে ধান আবাদ করেছিলেন। বুনেছিলেন ব্রিধান-২৯ জাত। ২ মে কয়েকজনকে নিয়ে ধান কাটতে গিয়ে দেখেন সব তলিয়েছে বানের জলে। ঢলের পানিতে দাঁড়িয়ে ঢলে পড়েন চিরতরে।
মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর। চাবাগানে সবার কাজ থাকে না। বেশিরভাগ দিনমজুরি করেন। কুলাউড়ার চালতাপুর চাবাগানের রঞ্জন বাউড়িও সেরকমই একজন। বোরো মওসুমের ধান কাটতে গিয়েছিলেন রাজনগরের ফতেপুর ইউনিয়নে তলিয়ে যাওয়া কাউয়াদীঘি হাওরে। ৪ মে ঢলের ঠান্ডা পানির ধাক্কায় অসুস্থ হয়ে পানিতেই ডুবে যান। ধান কাটতে কাটতেই ঢলে পড়েন জমিনে।
হাওরে ঢলে পড়া কৃষক পরিবারের পাশে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। এইসব নিদারুণ মৃত্যুর দায় নিতে হবে। কেবলমাত্র ফসল রক্সা বাঁধ দিয়ে কৃষকের এই ঢলে পড়া ঠেকানো যাবে না। এমনকি কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল ক্রয় করেও নয়। এর জন্য হাওরের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় আমূল রূপান্তর জরুরি।
বজ্রাঘাতে হাওরে কৃষকের এত মৃত্যু কেন?
২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি’ শীর্ষক কর্মশালা থেকে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার তুলনায় দেশে প্রতিবছর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩ হাজার ৪৮৫ জন নিহত হয়েছেন। দেকা গেছে বজ্রপাতে দেশে সবচে বেশি নিহত হন হাওরাঞ্চলে কৃষক ও ক্ষেতমজুর। কারণ বোরো মওসুমে ধান কাটার সময়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে, আর কৃষকেরা তখন খোলা মাঠে হাওরের জমিনে কাজ করেন। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত দেশে বিভিন্নস্থানে বজ্রপাতে ৭১ জন নিহত হয়েছেন।
নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাও দেখাচ্ছে, হাওরাঞ্চল নেত্রকোণা বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল। ৬ বছরে ৬২ জন বজ্রঘাতে মারা গেছেন, যার বেশিরভাগ কৃষক। স্থানীয় সূত্রমতে নেত্রকোণায় ২০২৫ সালে ১৬ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২২ সালে ৩জন, ২০২১ সালে ১৫ জন এবং ২০২০ সালে ৮জন বজ্রাঘাতে মারা যান। হাওরাঞ্চলে বোরো মওসুমে ধান কাটার মওসুম এপ্রিল-মে মাসেই বেশি বজ্রপাত হয়। ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল বোরো মওসুমের ধান কাটার সময় দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশব্যাপি বজ্রবৃষ্টি হয়। সুনামগঞ্জ, রংপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে মোট ১২ জন মারা যান। এর ভেতর ৯ জনই কৃষক।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের রামপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক সুনাম উদ্দিন ধান কাটতে গিয়েছিলেন বড় ভাকৈর ইউনিয়নের মমিনা হাওরে। ধান কাটতে কাটতে ১৮ এপ্রিল ২০২৬ বজ্রপাতের আঘাতে জমিনেই মারা যান তিনি। একইদিনে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের জয়কা ইউনিয়নের কলাবাগ গ্রামের কৃষক হলুদ মিয়া করিমগঞ্জের গুণধর এলাকার বড় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। নেত্রকোণার আটপাড়ার সুখারি ইউনিয়নের ধলার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে কৃষক আলতু মিয়াও একই দিনে বজ্রপাতে মারা যান। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের ছোট ভাকৈর গ্রামের কৃষক ফরাস মিয়া ২০২৬ সালের পয়লা এপ্রিল শৌলাগড় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। তার সাথে থাকা কৃষক সামছুল ইসলাম, জায়েদ মিয়া ও হাফিজুর রহমান সকলেই আহত হন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের ধীত গ্রামের কৃষক রবীন্দ্র দাস ও টিপু দাস অন্যদের সাথে হাওরে ধান কাটতে গিয়েছিলেন ২২ এপ্রিল ২০২৬। বজ্রপাতে জমিনেই মারা যান দুজন। আহত হন আরো সাত কৃষক।
২০২৬ সালের ১৩ মার্চ নেত্রকোণার খালিয়াজুরীতে বাজন্তি হাওরে জমিনে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান চাকুয়া ইউনিয়নের চাকুয়া গ্রামের কৃষক সুধীর দাস। একইদিনে জমিনে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান দুর্গাপুর উপজেলার চন্ডীগড় ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের আকাশ মিয়া। ২০২৬ সালের পহেলা মে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের উদগল হাওরে ধান কাটতে গিয়েছিলেন গোপালপুর গ্রামের কৃষক রিংকু দাস, রাকেশ দাস ও কালিপদ দাস। বজ্রপাতে জমিনে মারা যান রিংকু দাস, বাকীরা গুরুতর আহত হন।
২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল নেত্রকোণার খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক শহীদ মিয়া রাজঘাট হাওরে মরিচ ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার হাবিবুর রহমান, রহমত উল্লাহ, জামালগঞ্জের নাজমুল হোসেন, তাহিরপুরের আবুল কালাম, দিরাইয়ের লিটন মিয়া। এরা কেউ টগার হাওর, মাটিয়ান হাওর, পাগনার হাওর, বরাম হাওরে ধান কাটতে গিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের কৃষক রহমত আলী উজ্জ্বল ও গফরগাঁওয়ের মমতাজ আলী খানও ধান কাটতে গিয়েছিলেন। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মমিনা হাওরে ধান কাটতে গিয়ে একইদিনে সুনাম উদ্দিন বজ্রাঘাতে মারা যান। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে কলাবাগ গ্রামের কৃষক হরুদ মিয়াও বড় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান।
বজ্রাঘাতে বছরের পর বছর হাওরে কৃষকের মৃত্যু সামাল দেয়ার কোনো পদক্ষেপ নাই। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে আমাদের ভাতে নিহত কৃষকদের রক্তের দাগ লেগে আছে। কৃষি ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে এর সুরাহা করা দরকার। বোরো মওসুমের ধান কাটা পঞ্জিকা এবং দুর্যোগ পূর্বাভাসের সমন্বয় করে হাওরাঞ্চলে আগাম সতর্কবার্তা এবং কৃষকের নিরাপত্তা সক্রিয় করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। গ্রাম ও বসতির দূরত্ব এবং কৃষিজমিনের মানচিত্র অনুযায়ী হাওরাঞ্চলে বজ্র-নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। একইসাথে তালসহ হাওরের জলাবন সুরক্ষা করা দরকার।
ঢলে পড়া ধান ও মাছেদের সংসার
বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের ভাটিতে হাওরের অবস্থান। ভাটিবাংলার রাজধানী হিসেবে খ্যাত সুনামগঞ্জে দেশের সর্বাদিক নদ-নদী। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলেও তলায় হাওর। হাওর-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক পানির আধার গুলো রুদ্ধ। বৃষ্টি বা ঢলের পানি যাওয়ার জায়গা নাই। তাই জলবাদ্ধ-বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে হাওর।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রমতে, চলতি বছরেও হাওরের কালনী, ধনু, বৌলাই, মেঘনা, কুশিয়ারা, মগরা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী, করাতিয়া, কলমারবাক, বৈঠাখালী, কলকলিয়া, মনু, উবদাখালী নদীর পানি বেড়েছে। কেবল বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নয়, হাওর ও নদীর শরীরকে বুঝতে হবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং প্রবাহিত হওয়ার রুদ্ধ পথ গুলোকে মুক্ত করতে হবে।
হাওরে গভীর পানির দেশি ধান জাত গুলোকেই চাষের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এসব ধান আগাম এবং অনেক জাত গভীর পানিতে তলিয়ে গেলেও পঁচে নষ্ট হয় না। সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো মওসুমে ধান হয় ১১ লাখ মেট্রিক টন। সুনামগঞ্জ জেলার বাৎসরিক চাহিদা ৫ লাখ মেট্রিক টন। নিজেদের চাহিদার চেয়ে দ্বিগুন ধান এই ভাটিবাংলাকে আবাদ করতে হয়। কিন্তু এই বিশেষ অঞ্চলে এই বিপদজনক আবাদের কী দরকার? কৃষক, ফসল এবং জীবনের দামে? ঋণ-কর্জ করে, নানা সামাজিক সংকট ও সংঘাতকে উসকে রেখে। হাওরের জন্য হাওরের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া ধানেদের আহাজারি রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। এইসব দেশি ধানজাতের ভেতরেই হাওরের সংকট সমাধানের জিনলিপি গ্রন্থিত আছে।
ইতোমধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে হাওরের নানিদ ও লোচ মাছ। দেশি মাছের বিচরণঅঞ্চল ইজারা নিয়েছে ক্ষমতাধরেরা। উজানের মেঘালয় পাহাড়ের খননপ্রকল্প থেকে আসা রাসায়নিক বর্জ্য এবং হাওরাঞ্চলের কৃষিতে ব্যবহৃত বিষের তলানি জমা হচ্ছে হাওরের বিলে। মাছেদের ডিম, পোণা ও বৈচিত্র্য সমূলে নির্বংশ হচ্ছে। একইসাথে হাওরে ব্যবহৃত হচ্ছে চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জালসহ নিষিদ্ধ বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার সকল সরঞ্জাম। ২০১০, ২০১৩, ২০১৫, ২০১৭ হাওরে মাছের মড়ক লেগেছিল। এমনকি পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া ফসল পঁচে হাওরে মরেছিল মাছসহ বহু জলজ প্রাণ। মাছেদের সুরক্ষা উজান থেকে ভাটিতে মাছেদের প্রাকৃতিক বিচরণ অঞ্চল মুক্ত রাখতে হবে। হাওর একইসাথে দেশীয় ও পরিযায়ী জলচর পাখিদের এক অন্যতম বসতি অঞ্চল। অথচ হাওরাঞ্চলেই সবচে বেশি পাখি নিধন ও বাণিজ্যিকভাবে পাখির লাশ হোটেলে খাবার হিসেবে বিক্রি হয়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি
হাওরে কৃষক, ফসল, প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ জীবনের সুরক্ষা দিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। স্থানীয় পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক পরিসর সর্বত্র এই সদিচ্ছা সক্রিয় থাকতে হবে। তানা না হলে জারি থাকা রাজনৈতিক বিবাদ, শ্রেণিসংঘাত, নয়াউদারবাদী বাজার ও কাঠামোগত বৈষম্যর অবসান ঘটবে না। আর এসব অবসান না হলে শুধু ফসল বাঁধের গোয়াতুর্মি দিয়ে হাওরের জীবন বাঁচবে না। একইসাথে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটে হাওরের বহুমুখী যন্ত্রণা আরো জটিল দুর্গম রূপ ধারণ করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু ও মানবাধিকারের ন্যায্যতার মঞ্চে হাওরের ঢলে পড়া কৃষক ও ফসলের জীবনকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করারা যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
পাভেল পার্থ, গবেষক ও লেখক। [email protected]
মন্তব্য করুন

