পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন হতে হবে মানবাধিকারসম্মত, অংশগ্রহণমূলক এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ছবি - সংগৃহীত
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব সংকট
চুক্তি, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার প্রশ্ন (প্রথম পর্ব)
মিলিন্দ মারমা
মিলিন্দ মারমা
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:২৬ এএম
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে চুক্তি, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, নেতৃত্বের কাঠামো এবং প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এই জটিল বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করেছেন লেখক ও অধিকারকর্মী মিলিন্দ মারমা। দুই পর্বের এই নিবন্ধের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।
রাষ্ট্র পরিচালনায় উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচন মানবসভ্যতার প্রাচীনতম রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয়। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, একটি রাষ্ট্রের সাফল্য বা ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, দূরদর্শিতা এবং বাস্তবতা অনুধাবনের সক্ষমতার ওপর।
অখণ্ড ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১–২৯৭) রাষ্ট্রগঠন ও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর উত্থানের পেছনে ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কৌশল এবং উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও মিয়ানমারের ঐতিহাসিক গ্রন্থ Hmannan Maha Yazawindawgyi-এ শাক্য বংশের পতন, বিরূঢ়কের প্রতিশোধ এবং পরবর্তী সময়ে মৌর্য বংশের উত্থানের ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। পরে তক্ষশীলার পণ্ডিত চাণক্যের কৌশলগত নেতৃত্বে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধের নন্দ শাসক ধনানন্দকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
এই ইতিহাসের মূল শিক্ষা ব্যক্তি বা বংশের উত্থান-পতন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্ব। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এ রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিশেষ করে মন্ত্রী বা অমাত্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রশাসনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী, মন্ত্রী নিয়োগ ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত। একজন অমাত্যের মধ্যে থাকতে হতো জ্ঞান, সততা, নৈতিক দৃঢ়তা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আত্মসংযম, সংকট মোকাবিলার সামর্থ্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি অটল দায়বদ্ধতা। একই সঙ্গে তিনি এমন ব্যক্তি হবেন, যিনি অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি না করে সমাজে আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও একটি নীতি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট অঞ্চল, জনগোষ্ঠী, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও সংবেদনশীলতা থাকা অপরিহার্য।
নিয়োগ ও বিতর্কের সূত্রপাত
এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ নতুন করে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে। নতুন মন্ত্রিসভায় রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী এবং চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়।
দীপেন দেওয়ান পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হলেও মীর হেলাল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা নন এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরও সদস্য নন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন দশক আগে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর এই ধরনের নিয়োগ এবারই প্রথম।
এরপরই প্রশ্ন ওঠে—এই সিদ্ধান্ত কি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
চুক্তির (ঘ) খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, "উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।"
অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলের নির্বাচিত পাহাড়ি প্রতিনিধিদের হাতেই ছিল। ফলে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে অনেকেই চুক্তির উদ্দেশ্য ও চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
নিয়োগের পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। প্রশ্ন দেখা দেয়—এটি কি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনা ও প্রতিনিধিত্বের ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে?
২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি 'পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন' নামে একটি নাগরিক জোট অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার এবং দপ্তর পুনর্বণ্টনের দাবি জানায়। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী নেতৃত্বে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই ১৯৯৭ সালের চুক্তির অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য।
৩ মার্চ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি চুক্তি বাস্তবায়নের সময়বদ্ধ রোডম্যাপ, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির পুনর্গঠন, ভূমি কমিশন সক্রিয় করা এবং পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ শুরুর দাবি জানায়।
তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অঞ্চল। এখানে প্রতিনিধিত্ব কেবল প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয় নয়; এটি আস্থা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন পার্বত্য অঞ্চলের ৩৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। ২৫ ফেব্রুয়ারির এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রতিমন্ত্রীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। International Chittagong Hill Tracts Commission এবং International Work Group for Indigenous Affairs (IWGIA) নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন জানালেও একই মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আদিবাসীদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে তারা চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ, ভূমি কমিশন সক্রিয়করণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানায়।
বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ভূমি বিরোধ, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তা সংকট ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মতো সমস্যায় জর্জরিত। ফলে এ অঞ্চলের নীতিনির্ধারণে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো ও সংঘাতের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অপরিহার্য। সমালোচকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ বিদ্যমান আস্থার সংকট আরও গভীর করতে পারে।
উন্নয়ন, ইকোট্যুরিজম ও মানবাধিকার প্রশ্ন
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ে ইকোট্যুরিজম সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। তবে এর মধ্যেই উন্নয়ন, ভূমি অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে আসে।
গত বছর জাতিসংঘের Special Procedures ব্যবস্থার আওতায় নয়জন বিশেষ প্রতিবেদক ও ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগের ব্যাখ্যা চান যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন, অবকাঠামো ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আদিবাসীদের স্বাধীন, পূর্বানুমোদিত ও অবহিত সম্মতি (FPIC) নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
চিঠিতে বলা হয়, যথাযথ অংশগ্রহণ ও সম্মতি ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঐতিহ্যগত ভূমি হারানো, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, প্রান্তিকীকরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ভূমি ইজারা, পরিবেশগত সুরক্ষা, ব্যবসা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের নির্দেশক নীতিমালা বাস্তবায়ন, মানবাধিকারভিত্তিক যাচাই, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ এবং লাভ-বণ্টনে স্থানীয়দের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালিত প্রকল্পে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা এবং FPIC অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সে বিষয়েও সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।
তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ওই চিঠির আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। একই সঙ্গে নবগঠিত সরকারের সময়েও এসব উদ্বেগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো গুণগত পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
আস্থার সংকট ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
বর্তমান বাস্তবতায় যথাযথ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ এবং আদিবাসীদের স্বাধীন, পূর্বানুমোদিত ও অবহিত সম্মতি ছাড়া নতুন ইকোট্যুরিজম বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে মানবাধিকারসম্মত, অংশগ্রহণমূলক এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের প্রশ্নটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি চুক্তি বাস্তবায়ন, প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
সরকার যদি দপ্তর পুনর্বণ্টন, চুক্তি বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং অংশগ্রহণমূলক সংলাপের উদ্যোগ নিত, তাহলে আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক উদ্বেগ ও পারস্পরিক অনাস্থা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বিচক্ষণতা, সংবেদনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো জটিল ও স্পর্শকাতর অঞ্চলের ক্ষেত্রে এই সত্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
মন্তব্য করুন

