আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ জাতীয় মাথাপিছু বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম, ছবি: সংগৃহীত
মিলিন্দ মারমা
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম
আমার মায়ের জন্ম শঙ্খ নদীর ভাটি অঞ্চলের এক আদিবাসী পরিবারে। নানা ছিলেন একজন প্রভাবশালী ও সম্পদশালী হেডম্যান। ব্রিটিশ শাসনামলে কুকি বিদ্রোহের সময় শঙ্খ নদীর উজানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর গ্রামগুলো কুকিদের ধারাবাহিক আক্রমণের শিকার হতো। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের অনেকেই ভাটি অঞ্চলে এসে আশ্রয় নেন। আমার মায়ের পূর্বপুরুষ ও পূর্ব-নারীরাও তখন আত্মরক্ষার তাগিদে ভাটি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছিলাম, আমাদের বংশের একজন পরমা সুন্দরী মারমা নারী কুকিদের দ্বারা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। কুকিদের আক্রমণের সময় গ্রামের সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তিনি কুকিদের হাতে ধরা পড়েন। তিনি নাকি অপহরণ কারীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন : "হারামজাদারা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিস কেন? আমাকে মেরে কেটে ফেলে যা। " তখন নাকি মানুষের গলা কেটে হত্যা করা আর ছিন্ন মুণ্ড ট্রফি হিসেবে নিয়ে যাওয়া ছিল কুকিদের শত্রু নিধনের রেওয়াজের অংশ। একারণে তারা "নরমুণ্ড শিকারী " বা হেড হান্টার বলে পরিচিতি পায়। মারমা নারীর কথার উত্তরে একজন কুকি ভাঙা ভাঙা মারমা ভাষায় নাকি উত্তর দিয়েছিলো: "তুমি তো খুব সুন্দরী। তোমাকে না মেরে বিয়ে করে রাখবো।" কয়েক দশক পর সেই নারীর আত্মীয় স্বজন অনেক চেষ্টার পর কুকিদের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে, মূল্যবান জিনিস পত্র উপঢৌকন দিয়ে সেই নারীকে ফিরিয়ে আনে। সেই সময় তিনি বিগত যৌবনা আর কয়েক সন্তানের জননী।
প্রচলিত অর্থে মা ছিলেন একজন নিরক্ষর মানুষ। কারণ তিনি বাংলা ভাষায় পড়তে বা লিখতে জানতেন না। কিন্তু তিনি বৌদ্ধ মন্দিরে ভিক্ষুদের কাছে মারমা ভাষায় পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন।তিনি নিয়মিত মারমা ভাষার বই পড়তেন। এছাড়া তিনি অসংখ্য প্রবাদ-প্রবচন জানতেন এবং আমাদের শেখাতেন। তিনি বহু লোককথাও জানতেন। ছোটবেলায় তাঁর মুখে শোনা অনেক লোকগল্প আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
শৈশবে এসব গল্পকে নিছক বিনোদনের উপকরণ বলেই মনে হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার উপলব্ধি হয়েছে, এগুলো শুধু বিনোদনের গল্প নয়; বরং এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা। এমনকি মনে হয়, বর্তমান সময়ের অনেক রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের সূত্রও হয়তো এসব লোককথার মধ্যে নিহিত রয়েছে। এমনই একটি লোককথা ছিল অজগর সাপকে নিয়ে: সৃষ্টির আদিতে পৃথিবীর সমস্ত বিষের একমাত্র মালিক ছিল অজগর। এই একচ্ছত্র শক্তি নিয়ে সে খুব গর্ব করত। একদিন নিজের বিষের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য সে এক মানুষকে দংশন করল এবং ফলাফল জানার জন্য একটি গিরগিটিকে পাঠাল। মানুষটি মারা গেল, কিন্তু গিরগিটি তার পরিবারের শোক ও কান্নাকে ভুল করে আনন্দ-উৎসব বলে মনে করল এবং ফিরে এসে জানাল যে লোকটি এখনও জীবিত। এই সংবাদ শুনে অজগর মনে করল, তার বিষের কোনো কার্যকারিতা নেই। তাই সে সব বিষ মাটিতে উগরে দিল। তখন বিচ্ছু, মাকড়সা, মৌমাছি, সাপ এবং আরও অনেক প্রাণী সেই বিষের একেকটি অংশ গ্রহণ করল। ফলে যে বিষ একসময় অজগরের একক দখলে ছিল, তা পৃথিবীর বহু প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। এই লোককথায় অজগরের বিষকে রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। গল্পে অজগর যেমন বিষের ওপর তার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পরিত্যাগ করে সেটিকে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিল, তেমনি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা ও সম্পদ যদি গুটি কয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না রেখে প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিকেন্দ্রীভূত করা যায়, তবে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের অনেকটাই লাঘব হতে পারে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আওতায় তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এটিকেও রাষ্ট্রক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের একটি বিশেষ রূপ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরেও এর মৌলিক ধারাগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় জনগণ এই বিকেন্দ্রীকরণের প্রত্যাশিত সুফল থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত রয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হলেও বিএনপি সরকার এখনো চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করতে পারেনি। ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। সম্প্রতি এএলআরডি (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) এবং গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিআরডি (সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) যৌথভাবে “পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যুব জনগোষ্ঠী, নগর দরিদ্র এবং ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ: একটি গবেষণা সমীক্ষা” শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীও জাতীয় বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিদ্যমান, তা এখনো কার্যকরভাবে দূর করা সম্ভব হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্ব ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের বাজেট-হিস্যা ০.১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। একইভাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.০৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দের তুলনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দ ৫৯.০২ শতাংশ কম। অর্থাৎ, উন্নয়ন ব্যয়ের বণ্টনের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের শিকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ সময় জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লক্ষ ধরা হলে, মাথাপিছু জাতীয় বাজেট বরাদ্দ দাঁড়ায় ৪৪,৯৬৩ টাকা। একই সময়ে জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ ছিল ৬,৯৫২ কোটি টাকা। আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ৫১ লক্ষ ধরে হিসাব করলে তাদের মাথাপিছু বাজেট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৩,৫৭৮ টাকা, যা জাতীয় মাথাপিছু বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।
এই বাস্তবতায় গবেষণার আলোকে বলা যায় যে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সে প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ বিবেচনা করা প্রয়োজন—
১। সমতল ও পার্বত্য উভয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট, হালনাগাদ এবং গোষ্ঠীভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরির লক্ষ্যে একটি বিশেষ আদিবাসী জনশুমারি পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা,
২। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি-অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ভূমি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে এবং এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদি বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে,
৩। সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন তদারকির জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় বা বিশেষায়িত সরকারি বিভাগ গঠনপূর্বক স্বতন্ত্র বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন,
৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে তা তিনটি পৃথক খাতে উপস্থাপন করা উচিত— (ক) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ, (খ) বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ এবং (গ) উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য যৌথ বরাদ্দ,
৫। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত এবং স্বেচ্ছায় সমতল অঞ্চলে পুনর্বাসনে আগ্রহী সেটেলার বাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্য একটি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং এ উদ্দেশ্যে ন্যূনতম ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা,
৬। দেশের প্রায় ৫১ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য উন্নয়ন ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তাদের জন্য কমপক্ষে ৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা।
আদিবাসীদের অজগর সাপের লোকগাথা, বাংলাদেশের স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে দেখা যায় যে ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য ও বঞ্চনা তৈরি করে, আর প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে। তবে নীতি ও কাঠামো থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সীমিত অংশগ্রহণ এই বিকেন্দ্রীকরণের সুফলকে এখনো পূর্ণতা দেয়নি। ফলে আদিবাসীদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে বিকেন্দ্রীকরণের সুফল পেতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
মিলিন্দ মারমা: লেখক ও অধিকার কর্মী
ইমেইল: [email protected]
মন্তব্য করুন

