Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে উদ্বেগ

রাখাইনদের গ্রাম পরিদর্শন করেছে ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস’ সদস্যরা

খোঁজ-খবর

কুয়াকাটার রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি সংকট

অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে উদ্বেগ

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শ্মশানভূমি ও পুনর্বাসন সংকট সরেজমিন পরিদর্শন করেছে মানবাধিকারভিত্তিক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস’-এর একটি প্রতিনিধি দল। গত ১২ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত তিন দিনের এই পরিদর্শনে প্রতিনিধি দলটি রাখাইন অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখে এবং স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ, বৌদ্ধ ভিক্ষু, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করে।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, রানের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং ল্যান্ড ইজ লাইফ-এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমাসহ অন্যান্যরা।

শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের ভূমি সংকট
পরিদর্শনের প্রথম দিন প্রতিনিধি দলটি কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ভিক্ষুদের সঙ্গে মতবিনিময় করে। সভায় বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু জানান, ব্রিটিশ আমলে ১৯৪৩ সালে ২ একর ৪৪ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিহারের অধিকাংশ জমি ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। ১৯৬২ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় উল্লেখযোগ্য অংশ অধিগ্রহণ করা হয়। বর্তমানে বিহারের দখলে রয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমি।
তিনি অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে বিহারের অবশিষ্ট জমিও অধিগ্রহণের চেষ্টা করছে। ফলে শুধু একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, পটুয়াখালী জেলার একমাত্র সীমা বিহার এবং একমাত্র সীমাঘরও বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপসম্পদা গ্রহণ ও ধর্মীয় আচার পালনের জন্য সীমাঘর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারের জমি দখলের অভিযোগ
মিশ্রিপাড়ার প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শনকালে বিহার কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় রাখাইন নেতারা জমি দখলের নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। বিহারের অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো জানান, দুই একরেরও বেশি জমি থাকলেও এর একটি বড় অংশ এখনও রেকর্ডভুক্ত হয়নি।
রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইনের অভিযোগ, ভূমি রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ায় অসাধু চক্রের মাধ্যমে বহু রাখাইন পরিবার প্রতারণার শিকার হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীরা দুই একর জমি বিক্রি করলেও জালিয়াতির মাধ্যমে পাঁচ একর পর্যন্ত জমি দখল করা হয়েছে। এমনকি আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও অনেক জমি উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।

শ্মশানভূমি দখলের অভিযোগ
নয়াপাড়া গ্রামের রাখাইন সম্প্রদায়ের শ্মশানভূমির একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, ওই জায়গায় গাছ লাগিয়ে দখল করে রেখেছে একটি বাঙালি পরিবার।
অভিযুক্ত পরিবারের সদস্য বাবুল আখতার জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা কয়েক দশক আগে রাখাইনদের কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন। তবে বিতর্কিত অংশটি তাদের মালিকানাধীন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে জমি জরিপ করে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করে।

পায়রা বন্দরের কারণে উদ্বাস্তু ৬ রাখাইন পরিবারের অনিশ্চিত জীবন
পরিদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পায়রা বন্দর প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া ছ-আনি পাড়া গ্রামের ছয়টি রাখাইন পরিবারের পুনর্বাসন পরিস্থিতি।
২০২১ সালে উচ্ছেদের পর পরিবারগুলোকে এখনও স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতিনিধি চিং দামো রাখাইন জানান, উচ্ছেদের সময় পুকুর, গাছ ও ফসলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ৯৬ লাখ টাকা দেওয়া হলেও স্থায়ী পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত মাসিক ৫ হাজার টাকা করে বাড়িভাড়া সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। মাত্র ছয় মাস সহায়তা দেওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
প্রতিনিধি দল পুনর্বাসনের জন্য নির্ধারিত জমি পরিদর্শন করে দেখতে পায় যে জমি চিহ্নিতকরণ সম্পন্ন হলেও এখনো মাটি ভরাট ও ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। চলতি জুন মাসেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পুনর্বাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ছবি: কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়

প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক ও পাঁচ দফা দাবি
পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিকের সঙ্গে মতবিনিময় করে।
বৈঠকে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মং চৌ থিন তালুকদার রাখাইন জনগোষ্ঠীর পক্ষে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—
এক. কলাপাড়ায় রাখাইনদের জন্য শ্মশানভূমি বরাদ্দ;
দুই. রাখাইন কালচারাল একাডেমি সংস্কার ও চালু; মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ;
তিন. বেদখল হওয়া ভূমি ও শ্মশান পুনরুদ্ধার এবং মামলা নিষ্পত্তি; 
চার. রাখাইন তাঁতশিল্পের বিকাশে প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা; এবং
পাঁচ. পায়রা বন্দরের কারণে উচ্ছেদ হওয়া ছ-আনি পাড়ার ছয় পরিবারের দ্রুত পুনর্বাসন ও নতুন ভূমির মালিকানা হস্তান্তর।

প্রশাসনের আশ্বাস
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক প্রতিনিধি দলের উত্থাপিত দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, জাল দলিলের মাধ্যমে রাখাইনদের ভূমি দখলের বহু অভিযোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং এসব বিষয়ে প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, রাখাইন কালচারাল একাডেমি পুনরায় চালু, রাখাইন তাঁতশিল্পের উন্নয়ন এবং পর্যটকদের জন্য রাখাইনদের পরিচালনায় একটি রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে রাখাইন জনগোষ্ঠী
তিন দিনের এই পরিদর্শনে উঠে এসেছে যে কুয়াকাটার রাখাইন জনগোষ্ঠী শুধু ভূমি হারানোর সংকটেই নয়, বরং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধ বিহার, শ্মশানভূমি, বসতভিটা এবং পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা তাদের জীবনকে প্রভাবিত করছে।
প্রতিনিধি দলের মতে, কুয়াকাটার রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় দ্রুত, কার্যকর এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব আরও বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মন্তব্য করুন

Logo