Logo

৬ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

আগমনী ও বিজয়ায় মায়ের কাছে মেয়ের ফেরা

ছবিঃ প্রতীকী ছবি, অনলাইন থেকে সংগৃহীত

ফিচার

লোকসাহিত্যে দুর্গা

আগমনী ও বিজয়ায় মায়ের কাছে মেয়ের ফেরা

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৯ পিএম

একজন মা তাঁর সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আছেন। মেয়ে আসবে শুনে তিনি তার পছন্দের খাবারের আয়োজন করছেন। কত কথা জমেছে। অথচ দেখা হওয়ার আনন্দের মধ্যেই বিদায়ের দিনটি মনে পড়ছে তাঁর। আগমনী গান শুনতে শুনতে এমন একটি সংসার কল্পনা করা যায়, যেখানে উৎসবের সমস্ত ব্যস্ততার কেন্দ্রে আছে দূরে থাকা মেয়েটি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে মা বুঝতে চাইছেন, কেমন কাটছে দিন। দুর্গার ঘরে ফেরার কাহিনি এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোকে ভাষা দিয়েছে। দেবীকে ঘিরে মানুষের যে বিপুল আয়োজন, তার ভেতরে শোনা যায় মেয়ের জন্য মায়ের উদ্বেগ, মায়ের কাছে ফেরার জন্য মেয়ের আকুলতা।


আগমনী ও বিজয়ার গান শুনলে উৎসবের মধ্যে সংসারের আলাদা একটি সময় অনুভব করা যায়। সেখানে অপেক্ষা দীর্ঘ, মিলন সংক্ষিপ্ত। বিদায় এসে পড়ে কথা ফুরানোর আগেই। দুর্গা জগতের মা, মেনকার কাছে তিনি মেয়ে। এই সম্পর্কের পরিবর্তনে ভাষার স্বরও বদলে যায়। দেবীর কাছে মানুষ আশ্রয় চায়; মেনকা সেই দেবীকেই নিজের আশ্রয়ে রাখতে চান। সন্তানকে আগলে রাখার ইচ্ছায় তিনি উমার (দুর্গার আরেক নাম) অসীম ক্ষমতার কথা ভুলে যান। মেয়ে ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, স্বামীর সংসারে কষ্ট পাচ্ছে কি না, এসব ভাবনা তাঁকে অস্থির করে। দেবীর মাহাত্ম্য অক্ষুণ্ণ রেখেও কবিরা তাঁকে মাতৃস্নেহের কাছে অসহায় শিশুর মতো আদরের পাত্র করেছেন। এই দ্বৈত অনুভূতিতেই আগমনীর কাব্যিক মাধুর্য।


শাক্ত পদাবলীর আগমনী পর্যায়ে উমার পিতৃগৃহে আসার প্রস্তুতি ও আনন্দ, বিজয়া পর্যায়ে তাঁর ফিরে যাওয়ার বেদনা প্রাধান্য পায়। মেনকার কথায় সেই অভিজ্ঞতা বিশেষ তীব্রতা পেয়েছে। তিনি গিরিরাজকে তাগিদ দেন, মেয়েকে আনতে বলেন, দেরিতে বিরক্ত হন। কখনো স্বপ্নে উমাকে দেখে জেগে ওঠেন উৎকণ্ঠায়। মেয়ের অনুপস্থিতি তাঁর ঘুমের মধ্যেও প্রবেশ করে। ফলে আগমনের অনেক আগেই উমা মায়ের মনের ঘরে এসে পৌঁছান। স্বপ্নের এই ব্যবহার লক্ষ করার মতো। দূরে থাকা মেয়ের খবর না পেলে মায়ের মনে নানা আশঙ্কা জাগে। মেয়ে কেমন আছে, কোনো কষ্টে আছে কি না, এসব ভাবনা তাঁকে অস্থির করে তোলে। মেনকার স্বপ্নে উমার যে রূপ ফুটে ওঠে, তার মধ্যেও মায়ের এই উদ্বেগ মিশে আছে। তাই সেই স্বপ্ন থেকে উমার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। কবি এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগান। উমার অবস্থার চেয়ে মেনকার উৎকণ্ঠাই পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বপ্ন ভাঙার পর মেয়েকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা আরও তীব্র হয়। মেনকার স্নেহে জেদও আছে। মেয়ে এলে তাঁকে আর পাঠাবেন না, এমন প্রতিজ্ঞার মধ্যে লোকনিন্দা উপেক্ষা করার সাহস শোনা যায়। সংসারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সামনে একজন মা নিজের ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করছেন। উমার স্বামীর মর্যাদাও সেখানে তাঁর আপত্তি থামাতে পারে না। মেয়ের কষ্টের আশঙ্কা তাঁকে প্রতিবাদী করে তোলে। এই মুহূর্তে মাতৃত্বের ভাষা কান্না ছাড়িয়ে বিরোধিতার ভাষা পায়।


রবীন্দ্রনাথ ‘লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ প্রবন্ধে হরগৌরীর কাহিনির সঙ্গে বাংলার ঘরোয়া জীবনের সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। তাঁর পাঠে দেবদম্পতির সংসারের মধ্যে মানুষের পরিচিত অভাব, অভিমান ও স্নেহ প্রবেশ করেছে। এই সূত্রে আগমনীকে বুঝতে গেলে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সংযোগটিও বুঝতে হয়। শিবের সংসার বিমুখতা মেনকার উদ্বেগ বাড়ায়; গিরিরাজের বিলম্ব তাঁর ক্ষোভের কারণ হয়। দেবতার পরিচয় নিয়েই চরিত্রগুলো পারিবারিক কথোপকথনে অংশ নেয়। ফলে পৌরাণিক কাহিনি শ্রোতার আপন সংসারের খুব কাছে আসে। তবে লোকসাহিত্য ও শাক্ত পদাবলীকে পুরোপুরি এক করে ফেললে তাদের রচনার ভিন্নতা হারায়। মুখে প্রচলিত ছড়া ও গানের সঙ্গে পরিচিত কবিদের রচিত পদের আদান প্রদান আছে। লিখিত পদও মানুষের কণ্ঠে ছড়ায়, নতুন উচ্চারণে ঘনিষ্ঠতা পায়। রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো কবিদের রচনায় মাতৃস্নেহের অনুভূতি ব্যক্তিগত কাব্য প্রতিভার স্পর্শ পেয়েছে। আবার গায়কের কণ্ঠ, টান, বিরতি এবং শ্রোতার স্মৃতি সেই অনুভূতিকে প্রতিবার নতুন করে জাগায়। পাঠের সময় যে শব্দটি সাধারণ মনে হয়, সুরে তার উচ্চারণেই কারও চোখ ভিজে উঠতে পারে।


গানের সম্বোধনগুলোও এই ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। মেয়েকে ডাকার মধ্যে আদর মেশে, স্বামীকে ডাকার মধ্যে অনুযোগ। বর্ণনার প্রয়োজন কমে আসে। অল্প কথায় সম্পর্কের উত্তাপ টের পাওয়া যায়। একই অনুরোধের পুনরাবৃত্তি অধৈর্য মনের ছন্দ তৈরি করে, ছোট উচ্চারণে জমে ওঠে অনেক দিনের না বলা কথা। শ্রোতা তখন ঘটনার বিবরণ শোনার সঙ্গে একটি কণ্ঠের সঙ্গী হন। সেই কণ্ঠের কাঁপনেই মেনকার দুঃখ বহু মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়, আপন ব্যথার ভাষা পায়। এই গানের উমাকে পড়তে গিয়ে মেয়ের নিজের কণ্ঠের দিকেও কান দেওয়া প্রয়োজন। মেনকার আবেগ এত প্রবল যে পাঠকের সমস্ত মনোযোগ সহজেই তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে। 


উমার আসা, থাকা, ফিরে যাওয়া নিয়ে মা, বাবা ও স্বামীর ইচ্ছা আলোচিত হয়। সেই কথাবার্তার মধ্যে উমার আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রকাশ পেল, তা খেয়াল করলে পাঠের আরেকটি স্তর খোলে। মায়ের কাছে ফিরতে চাওয়ার সঙ্গে তাঁর স্নেহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। সেই সঙ্গে আছে শৈশবের পরিচিত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর ইচ্ছা। সেখানে মেয়ে মায়ের যত্ন পায়, নিজের সুখদুঃখের কথা বলতে পারে। বিবাহিত মেয়ের কাছে তাই বাবার বাড়ি স্নেহ, স্বস্তি ও শৈশবের স্মৃতিতে ফেরার জায়গা। যে ঘরে তার বেড়ে ওঠা, সেখানে ফিরে নিজের আগের জীবনটিকেও ছুঁয়ে দেখা সম্ভব। সংসারের দায়িত্বের মধ্যে চাপা পড়া ছোট ছোট ইচ্ছা, নির্ভয়ে অভিমান করার অভ্যাস, মায়ের কাছে অনর্গল কথা বলার স্বস্তি ফিরে পেতে মন চায়। আগমনীর আবেগকে এই দিক থেকে পড়লে ঘরে ফেরা নিজের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে। তবে প্রত্যেক মেয়ের পিতৃগৃহে একই সুখের স্মৃতি আছে, এমন ধারণা চাপিয়ে দিলে জীবনের বহু অভিজ্ঞতা বাদ পড়বে। উমার কাহিনি একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষাকে কাব্যরূপ দিয়েছে।


বিজয়ার গানে মেয়ের বিদায়ের সময় যত এগিয়ে আসে, মায়ের মনে হয়, একসঙ্গে থাকার সময়টুকু তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আসার আগে যে দিন কাটতে চাইত না, মিলনের পরে সেই দিনই দ্রুত ফুরিয়ে আসে। নবমীর রাত দীর্ঘ করার আকুতিতে এই বদল সবচেয়ে মর্মস্পর্শী। রাত শেষ হলে বিদায় এগিয়ে আসবে। প্রিয় মানুষটি চলে যাবে ভেবে সময়কে থামিয়ে দিতে ইচ্ছা করে, যেন তাকে আরও কিছুক্ষণ কাছে রাখা যায়, আরও কিছু কথা বলা যায়। একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো এত দ্রুত ফুরিয়ে আসুক, মন তা মেনে নিতে পারে না। সময়কে থামানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, তবু ভালোবাসা থেকে এমন আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। কবিতায় সেই চাওয়াই প্রকাশ পায়। মানুষটি তখনো পাশে আছে, কথা বলছে, তার সঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ আসন্ন বিদায়ের কথা মনে হতেই তাকে হারানোর কষ্ট শুরু হয়। সে চলে যাওয়ার পর চারপাশ কতটা শূন্য লাগবে, সেই ভাবনা এখনকার আনন্দকেও বিষণ্ণ করে তোলে।


উমা তখনো ঘরে, অথচ মেনকা তাঁর চলে যাওয়ার পরের শূন্যতা অনুভব করছেন। এমন অনুভূতি আমাদের পরিচিত। প্রিয়জন পাশে বসে আছেন, তবু তাঁর যাত্রার কথা মনে পড়ায় কথার মধ্যে বিরতি আসে। বিজয়ার গান সেই বিরতিকে দীর্ঘ করে। উৎসবের আনন্দ তখন নিজের ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। তবু কন্যাবিদায়ের বেদনাকে নারীর অনিবার্য ভাগ্য হিসেবে গ্রহণ করলে গানের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়। মেনকার আপত্তির মধ্যেই মেয়েকে দূরে পাঠানোর সামাজিক অভ্যাস নিয়ে অস্বস্তি আছে। আজকের পাঠক সেই অস্বস্তিকে আরও প্রসারিত করতে পারেন। মেয়ে কোথায় থাকবে, কতদিন মায়ের কাছে কাটাবে, কখন ফিরবে, এসব সিদ্ধান্তে তার নিজের ইচ্ছার গুরুত্ব ভাবতে পারেন। 


বিজয়ার পর মায়ের ঘরটির কথা ভাবি। উৎসবের আয়োজন গুটিয়ে এসেছে, মেয়ে ফিরে গেছে নিজের সংসারে। একা ঘরে মায়ের মনে পড়ছে মেয়ের সঙ্গে কাটানো সময়, দুজনের কথোপকথন। আরও কত কথা বলার ছিল, সেসবও মনে আসছে। সাহিত্যে এমন অনুভূতির বর্ণনা পড়ে আজকের পাঠকও নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। বহু আগে লেখা মানুষের সুখদুঃখ এভাবেই তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। আগামী শরতের অপেক্ষা শুরু হবে, কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় অনুপস্থিতিই প্রবল। লোকসাহিত্যের দুর্গা এই সন্ধ্যার মধ্যে আমাদের কাছে ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেন। তাঁর দশ হাতের অস্ত্রের পাশেই মায়ের বাড়ানো দুটি হাত মনে পড়ে। সেই হাত মেয়েকে আরও কিছুক্ষণ কাছে রাখতে চায়।

মন্তব্য করুন

Logo