ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
উৎপাদন কি শ্রমিকের জীবনের চেয়ে বড়!
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম
একজন অসুস্থ শ্রমিকের ছুটি চাওয়ার অধিকার যদি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার কাছে পরাজিত হয়, আর কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর পরও জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তবে প্রশ্ন শুধু মৃত্যুর নয়- প্রশ্ন গোটা শ্রমব্যবস্থার।
গত ২৫ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের নারী পোশাকশ্রমিক লিজা আক্তারের মৃত্যু ঘিরে সহকর্মীদের অভিযোগ, অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চেয়েও তিনি তা পাননি।
১৬ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ায় আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে কাজ করার সময় মারা যান সুমি আক্তার মিশু। মৃত্যুর ঠিক আগে কারখানার এক কর্মকর্তার আক্রমণাত্মক আচরণের দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে। এই দুজন পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, শ্রমিকের অসুস্থতা এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা যায়। সুমির মৃত্যুর কারণ এবং তার সঙ্গে আচরণের ভূমিকা নির্ধারণ করতে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
লিজার পর সুমি। এরপর কে?
এটা কোনো ইমোশনাল গতানুগতিক প্রশ্ন নয়। এটা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ব্যবস্থাপনা, মালিকপক্ষের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের সামনে ছুড়ে দেওয়া তীব্র অভিযোগ। যে শিল্পের সাফল্য নিয়ে আমরা গর্ব করি, যে শিল্পের রপ্তানি আয় দিয়ে অর্থনীতির শক্তি পরিমাপ করি, সেই শিল্পে একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে তার বিশ্রাম এবং চিকিৎসার অধিকার কেন অনিশ্চিত পড়ে? কেন ছুটি চাইতে গিয়ে তাকে চাকরি হারানোর ভয় পেতে হয়?
রপ্তানির হিসাব আছে, শ্রমিকের জীবনের হিসাব কোথায়?
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিজিএমই-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮.৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের মোট রপ্তানি আয়ে এ খাতের অংশ ছিল প্রায় ৮০.৬২ শতাংশ। এই বিপুল অর্থনৈতিক অবদানে আছে লাখ লাখ শ্রমিকের ঘাম মেশানো শ্রম। তাদের শ্রমে সচল থাকে কারখানা, পূরণ হয় বিদেশি বায়ারের পারচেজ অর্ডার আর বাড়তে থাকে গার্মেন্টস মালিকের মুনাফা। অথচ সেই শ্রমিক অসুস্থ হলে তার পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা কয়টা কারখানায় আছে? উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ছুটির আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া হলে তার দায় কে নেবে? পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করবে- কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মূল্য শ্রমিককে জীবন দিয়ে দিতে হবে কেন? শ্রমিক মানুষ, উৎপাদনের যন্ত্র নয়। তার জীবন কোনো কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম মূল্যবান নয়।
ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীতমৃত্যুর পরিসংখ্যানও কি আমাদের ঘুম ভাঙাবে না?
সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির সংবাদভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ৭১৩টি দুর্ঘটনায় অন্তত ৮০২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে ৬৩৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭৫৮ জন শ্রমিক। অর্থাৎ এক বছরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫.৮ শতাংশ। অবশ্য এই পরিসংখ্যান সব খাতের শ্রমিককের, শুধু পোশাকশিল্পের নয়। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় অন্তত ৭২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছরে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৯। সংগঠনটি একই সময়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও সহিংসতার ঘটনায় ৫৭৩ জন আহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেছে।
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক আহত বা মারা যাওয়ার প্রত্যেকটি সংখ্যার পেছনে আছে এক একটি পরিবার। কারও স্বামী বা স্ত্রী, কারও মা-বাবা, কারও সন্তান। একজন শ্রমিকের মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে পরিবারের আয়ের ভিত্তি, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবিকার স্বপ্ন। অথচ মৃত্যুর পর তদন্ত আর ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি এলেও কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অসুস্থ হওয়াও কি শ্রমিকের অপরাধ?
লিজার মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মীরা অভিযোগ করেছেন অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না পেয়ে তাকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তার বক্তব্যে উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতার প্রাথমিক ইঙ্গিতের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। মৃত্যুর কারণ এবং ছুটি না পাওয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। তবে যথাসময়ে চিকিৎসা ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা, ব্যবস্থাপনার অবহেলা ছিল কিনা- এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সুমির ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর ঠিক আগে এক কর্মকর্তাকে তার কাজের জায়গায় এসে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে দেখা গেছে। শ্রমিকপক্ষের অভিযোগ, সুমি অসুস্থ বোধ করছিলেন এবং ছুটি চেয়েও পাননি।
একজন শ্রমিকের পক্ষে দৈনিক মজুরি হারানো মানে খাবার, বাড়িভাড়া, ওষুধ কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা। তাই ছুটি চাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও চাকরি হারানোর ভয় তাকে তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত রাখে। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অসুস্থ শরীরেও কাজ করানো হলে তা নিছক ব্যবস্থাপনাগত কঠোরতা নয়, তা শ্রমিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।শ্রমিকের অসুস্থতার কথা জেনেও তা উপেক্ষা করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয় তখন সেই সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে?
আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১১৫ ও ১১৬ ধারায় নৈমিত্তিক ও অসুস্থতাজনিত ছুটির বিধান আছে। ১১৭ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে বাৎসরিক ছুটির অধিকারও আছে। কিন্তু আইনে অধিকার থাকা আর বাস্তবে তা ভোগ করতে পারা এক কথা নয়।
একজন শ্রমিক ছুটি চাইতে গিয়ে অপমানিত হলে, অসুস্থতার কথা জানিয়ে কাজ বন্ধ করতে ভয় পেলে কিংবা চিকিৎসার জন্য কর্মস্থল ছাড়ার সুযোগ না পেলে শুধু আইন দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং আইন লঙ্ঘিত হলে দৃশ্যমান জবাবদিহি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, শিল্প পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন- এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত কত দ্রুত শেষ হয়? দায় প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? একই ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, তার নিশ্চয়তা কে দেয়?
মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি, শ্রমিকদের বিক্ষোভের পর মিটিং আর সংবাদ প্রকাশের পর সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত পরিদর্শন, স্বাধীন তদন্ত, শ্রমিকের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা এবং দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা।
সুমির সন্তানদের ভবিষ্যতের দায় কে নেবে?
সুমি আক্তার মিশু দুই সন্তানের মা। তার মৃত্যুতে পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, বা লিজার পরিবার- তা কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তদন্তে অবহেলা বা আইনভঙ্গ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ, বকেয়া পাওনা এবং অন্যান্য ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে হবে। সুমির সন্তান কিংবা লিজার পরিবারের জীবিকা যেন আরও অনিশ্চয়তায় পড়ে না যায়, সে দায়িত্ব এড়ানো যাওয়া যাবে না। যে শ্রমিকের শ্রমে প্রতিষ্ঠান আয় করে, তার মৃত্যু হলে পরিবারের প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায় শেষ হবে? শ্রমিকের নিরাপত্তা কি ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে, নাকি কেবল আইনের ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা পূরণেই দায়িত্ব শেষ বলে ধরে নেওয়া হবে?
উৎপাদনের আগে মানুষ, মুনাফার আগে জীবন
লিজা আর সুমির মৃত্যুর ঘটনা পৃথকভাবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। ছুটি চাওয়ার ঘটনা, অসুস্থতার সময় ব্যবস্থাপনার প্রতিক্রিয়া, চিকিৎসা সহায়তা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
সব পোশাক কারখানায় জরুরি চিকিৎসা, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং অসুস্থ শ্রমিকের নিরাপদে কর্মস্থল ছাড়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ছুটি বা চিকিৎসা চাওয়ার কারণে হয়রানি কিংবা প্রতিশোধমূলক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ও নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেই চাকরি হারানোর ভয় তৈরি না হয়।
পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও শ্রমিকের অভিযোগের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে। জীবিকা নির্বাহের উপযোগী মজুরি, নিয়মমাফিক কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষাকে শিল্পনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। এগুলো বাড়তি সুবিধা নয়, নিরাপদ ও মানবিক শ্রমব্যবস্থার ন্যূনতম শর্ত।
যে শ্রমিকের হাতের সেলাই বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের পরিচয় তৈরি করে, সেই শ্রমিকের নিজের জীবন যদি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না হয়, তাহলে শিল্পসাফল্যের গর্ব অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। যে উন্নয়নে শ্রমিকের জীবন সুরক্ষিত নয়, যে মুনাফায় শ্রমিকের মর্যাদা নিশ্চিত নয়, সেই উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে।
মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে, শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া নয়। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, শিল্পের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধির পেছনে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করাও দায়িত্ব। আর সমাজকে বুঝতে হবে, শ্রমিকের মৃত্যুতে কয়েক দিনের ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার নীরব হয়ে গেলে এই চক্র ভাঙবে না।
লিজার মৃত্যুর পরও যদি ব্যবস্থা না বদলায়, সুমির মৃত্যুর পরও যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে পরবর্তী মৃত্যুর দায় এড়াবে কে?
আমরা আর কোনো শ্রমিকের নামের পাশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর তারিখ দেখতে চাই না। আর কোনো পরিবারকে কারখানার দরজায় দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার চাইতে দেখতে চাই না। আর কোনো অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি চাওয়ার আগে চাকরি হারানোর আশংকা করতে দেখতে চাই না।
লিজার পর সুমি- এই ধারাবাহিকতা এখানেই থামাতে হবে। শ্রমিকের জীবনকে উৎপাদনের নিচে নয়, উৎপাদনের কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে। কারণ কারখানা মানুষের জন্য, মানুষ কারখানার জন্য প্রাণ দেওয়ার যন্ত্র নয়।
মন্তব্য করুন

