ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
সন্তানকে বেহেশতের গ্যারান্টি দিতে গিয়ে আমরা পৃথিবীতেই তাকে নরকের মুখে ঠেলে দিচ্ছি না তো?
শরৎ চৌধুরী
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
আমরা বড় অদ্ভুত এক আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা জাতি। আধুনিক সমাজের 'নষ্টামি' আর অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচাতে আমরা আমাদের সন্তানকে তুলে দিচ্ছি আবাসিক বা ক্যাডেট মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভেতর। দরিদ্ররা দিচ্ছে পেটের দায়ে আর পরকালের আশায়, আর শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা দিচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত 'ইংলিশ মিডিয়াম হিফজ' বা ক্যাডেট মাদ্রাসায়—যাতে সন্তান স্মার্টও হয়, আবার 'সাচ্চা মুসলিম'ও থাকে।
কিন্তু এই 'নিরাপদ দুর্গে'র দরজা বন্ধ হওয়ার পর ভেতরে যখন নিষ্পাপ শিশুরা ধর্ষিত হয়, তখন আমাদের সমাজ, তথাকথিত 'তৌহিদী জনতা' এবং আমাদের 'সুশীল বুদ্ধিজীবীদের' ভূমিকা কী হয়? আসল রাজনীতিটা লুকিয়ে আছে এই ভয়ংকর সিন্ডিকেটে:
১. "ছেলে শিশু আবার ধর্ষিত হয় নাকি?"—মনস্তাত্ত্বিক অস্বীকৃতি ও 'বলাৎকার' শব্দের আড়াল:
আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় অন্ধত্ব হলো এই ধারণা যে—পুরুষ বা ছেলে শিশু কখনো ধর্ষিত হয় না! এই সামাজিক ট্যাবু ও অস্বীকৃতির সুযোগ নিয়েই আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে যুগের পর যুগ ধরে চলছে ছেলে শিশুদের ওপর ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন। অপরাধের ভয়াবহতা কমাতে এটিকে ‘ধর্ষণ’ না বলে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বলাৎকার’ বা ‘শয়তানের ধোঁকা’। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হলে রাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে আইন সংশোধন করে ছেলে শিশুদের ওপর হওয়া এই যৌন সহিংসতাকে সরাসরি 'ধর্ষণ' হিসেবে স্বীকৃতি দিতে! অথচ সমাজ ও অভিভাবকরা এখনো মনে করে—ছেলে তো, ও আর কী ধর্ষিত হবে! এই অস্বীকৃতিই ধর্ষকদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা কবচ।
২. মহিলা মাদ্রাসার দুর্ভেদ্য গোপনীয়তা ও নীরব কান্না:
ছেলে শিশুদের ধর্ষণের খবর তো তবু এখন দুই-একটা পত্রিকায় আসে, কিন্তু দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা আবাসিক মহিলা মাদ্রাসাগুলোর খবর কি কেউ জানে? ‘আদর্শ ও অনুগত স্ত্রী’ বানানোর কারখানা হিসেবে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে পুরুষ পরিচালক বা 'বড় হুজুর'দের হাতে। দুর্ভেদ্য পর্দার আড়ালে, বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই মেয়েদের শেখানো হয়—নারীর কণ্ঠস্বরও পর্দার অংশ, তাই নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও 'পাপ' বা 'নির্লজ্জতা'! ফলে স্পিরিচুয়াল গ্রুমিং, গোপন বিয়ের নামে যৌন নিপীড়ন কিংবা সরাসরি ধর্ষণের শিকার হলেও এই কিশোরী মেয়েগুলোর চিৎকার মাদ্রাসার উঁচু দেয়াল টপকে কখনোই বাইরে আসে না।
৩. ‘তৌহিদী জনতা’র সিলেক্টিভ আউটরেজ ও মব-পলিটিক্স:
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কারো কথায় সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে, কিংবা কোনো ভাস্কর্য বা সংস্কৃতির ইস্যু সামনে এলে যে 'তৌহিদী জনতা' মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ কাঁপিয়ে ফেলে—মাদ্রাসার ভেতর যখন আট বছরের ছেলে শিশু বা কিশোরী মেয়েটি ধর্ষিত হয়, তখন তাদের সেই ঈমানি জোশ কোথায় থাকে? কোনো শিশু ধর্ষকের বিরুদ্ধে কি আজ পর্যন্ত তৌহিদী জনতাকে রাস্তায় নামতে দেখেছেন? দেখেননি। বরং ফেনীর নুসরাতকে যখন মাদ্রাসার অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো, তখন এই মব উল্টো সেই ধর্ষক অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মিছিল করেছিল!
৪. ওয়াজের ভিউ ব্যবসা ও অনলাইনের ‘ষড়যন্ত্র’ সিন্ডিকেট:
রাতভর মাইক বাজিয়ে যেসব বক্তা নারীর পোশাক আর ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়ে গলা ফাটিয়ে এই মবকে উসকে দেন, নিজেদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের মহামারি নিয়ে তারা সম্পূর্ণ বোবা। আর খবরটি মিডিয়ায় এলেই অনলাইনের বট-নেটওয়ার্ক ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটিকে "আলেম সমাজ ও পর্দার বিরুদ্ধে মিডিয়ার নীল নকশা" বলে ধামাচাপা দিতে। ভিকটিম শিশুটির রক্তক্ষরণের চেয়ে তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে 'প্রতিষ্ঠানের ইজ্জত' আর হাজার কোটি টাকার মাদ্রাসা-অর্থনীতি।
৫. ‘সাবল্টার্ন’ তত্ত্বের ফেরিওয়ালা বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা:
এই দানবীয় কাঠামোকে সবচেয়ে বড় বৈধতা দিয়েছে আমাদের শহরের একদল তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী। পশ্চিমা কেতাব পড়ে আসা এই বুদ্ধিজীবীরা এতদিন ধরে এই উগ্র গোষ্ঠীটিকে ‘সাবল্টার্ন’ (নিম্নবর্গ বা প্রান্তিক শোষিত মানুষ) হিসেবে সাজিয়ে রেখেছিলেন। অথচ আজ যখন এই তথাকথিত ‘সাবল্টার্ন’রা গায়ের জোরে শত শত বছরের প্রাচীন মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়, ভিন্নমতের মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে, আর মাদ্রাসার অন্ধকার ঘরে দরিদ্রতম শিশু ও কিশোরীকে ধর্ষণ করে ৫০ হাজার টাকার সালিশে মুখ বন্ধ করে দেয়—তখন এই বুদ্ধিজীবীদের মুখে কুলুপ আঁটা! যে ‘সাবল্টার্ন’ অন্য প্রান্তিক মানুষের মাজার ভাঙে আর গরিবের সন্তানকে ধর্ষণ করে, তাকে ‘মজলুম’ সাজিয়ে রাখার এই বুদ্ধিবৃত্তিক দালালি আর কতদিন চলবে?
৬. আমাদের নিজেদের পক্ষাঘাত ও আপসকামিতা:
এই মব-পলিটিক্স আর বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা ধোঁয়াশার মাঝে পড়ে সবচেয়ে ট্র্যাজিক অবস্থা সাধারণ অভিভাবকদের। আমরা আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকটে এতটাই ভীত যে, "হুজুরের বিরুদ্ধে বললে পাপ হবে", "ছেলে মানুষের আবার ইজ্জত কী" অথবা "তৌহিদী জনতা একঘরে করে দেবে"—এই ভয়ে নিজের সন্তানের ধর্ষকের সাথেই আপস করে নিচ্ছি!
একবার বুকে হাত দিয়ে ভাবুন তো—একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আধিপত্য, বুদ্ধিজীবীদের তত্ত্ব চর্চা বা প্রতিষ্ঠানের ইজ্জত কি আপনার সন্তানের শৈশব আর সম্ভ্রমের চেয়েও বড়?
যেখানে মাজার ভাঙা আর মানুষ হত্যায় নীরবতা পালন করা হয়, আর শিশু ধর্ষককে বাঁচাতে ধর্ম ও পর্দার ঢাল ব্যবহার করা হয়—সেটি আর যাই হোক, মজলুমের রাজনীতি নয়; সেটি নিখাদ ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার রাজনীতি। সন্তানকে বাঁচাতে হলে আগে এই অন্ধ ভীতি, মব-পলিটিক্স এবং ভণ্ড বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা মায়াজাল থেকে নিজেদের মুক্ত করুন।
মন্তব্য করুন

