Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

আত্মসমর্পণের স্থানে ফোয়ারা কেন?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

আত্মসমর্পণের স্থানে ফোয়ারা কেন?

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলে আমি একবার থামতে চাই সেই জায়গায়, যেখানে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। চারপাশে গাছ, হাঁটার পথ, মানুষের ভিড়। এত কিছুর মাঝেও স্থানটির আলাদা পরিচয় আছে। সেখানে দাঁড়ানো একজন কিশোর যেন বুঝতে পারে, কী ঘটেছিল এই মাটিতে; কারা অস্ত্র সমর্পণ করেছিল; বাংলাদেশের মানুষ কোন দিনের জন্য নয় মাস অপেক্ষা করেছিল। সেই ঘটনাস্থলে আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যের বদলে পানির ফোয়ারা বসানোর উদ্যোগের খবর তাই আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে।
 
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান দুটিতে পরিকল্পিত ভাস্কর্যের পরিবর্তে পানির ফোয়ারা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। নকশা পরিমার্জনের কথাও আছে নথিতে। পরিকল্পনাটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তবে প্রকাশিত তথ্যই সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু করার যথেষ্ট কারণ।
 
একটি উদ্যানকে সুন্দর ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রয়োজন আছে। দর্শনার্থীর বসার জায়গা, হাঁটার পথ, আলো, পানি ও পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিতে হয়। ফোয়ারা সেই আয়োজনের অংশ হতে পারে। কিন্তু আত্মসমর্পণের নির্দিষ্ট স্থানে কী নির্মিত হবে, সেই সিদ্ধান্তের মাপকাঠি আলাদা। সেখানে নির্মাণের কাজ শুধু চোখে ভালো লাগা নয়; মানুষকে ঘটনাটি চিনিয়ে দেওয়া এবং স্থানটির পরিচয় ধরে রাখা।

১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক প্রত্যক্ষ, দৃশ্যমান পরিণতি। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় সেদিন কেবল ঘোষণায় সীমিত থাকেনি। একটি নির্দিষ্ট স্থানে, মানুষের উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণের দলিলে সই হয়েছিল। সেই কারণে স্থানটি সাধারণ খোলা জায়গার মতো ব্যবহার করা যায় না। তার পরিচয় অস্পষ্ট হলে পরবর্তী প্রজন্ম ঘটনাটি বইয়ে পড়বে, ছবি দেখবে, অথচ ঘটনাস্থলে গিয়ে তার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ খুঁজে পাবে না।
 
ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকতেই পারে। শিল্পীর কাজের ধরন, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা, আয়তন, নির্মাণসামগ্রী ও স্থানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে মতভেদও স্বাভাবিক। একটি দুর্বল নকশা সংশোধন করা যায়। উপযুক্ত নকশার জন্য নতুন করে শিল্পী ও গবেষকদের সঙ্গে বসা যায়। কিন্তু সেই আলোচনার জায়গা থেকে আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি সরিয়ে ফোয়ারা বসানোর প্রস্তাব এলে তার কারণ জনসমক্ষে জানাতে হবে। সমস্যাটি ভাস্কর্যের নকশায় থাকলে নকশা ঠিক করার পথ কেন নেওয়া হচ্ছে না, সরকারকে তা ব্যাখ্যা করতে হবে। আরও একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ঘটনাস্থল চিহ্নিত করার সময় ঐতিহাসিক নথি, পুরোনো ছবি, মানচিত্র ও গবেষণা মিলিয়ে নির্দিষ্ট পরিসর নির্ধারণ করা উচিত। সময়ের সঙ্গে উদ্যানের চেহারা বদলেছে। ফলে নির্মাণের আগে ঘটনাস্থলের অবস্থান ও সীমানা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একমত হওয়া জরুরি। ভুল জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করলে বড় ব্যয় করেও মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
 
আত্মসমর্পণের স্থানটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সেই আলোচনায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পেতে হবে। ইতিহাসবিদেরা ঘটনার দলিল ও স্থানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করবেন। শিল্পীরা ভাববেন, দৃশ্যটি কীভাবে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা যায়। স্থপতি ও সংরক্ষণকর্মীরা উদ্যানের খোলা পরিসর, গাছপালা এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের বিষয় বিবেচনা করবেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীর কথাও শোনা দরকার। কারণ এই উদ্যান শেষ পর্যন্ত মানুষের ব্যবহারের জায়গা। কর্তৃপক্ষ চাইলে সংশোধিত নকশা প্রকাশ করে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। কোথায় ভাস্কর্য থাকার কথা ছিল, ফোয়ারা কোথায় প্রস্তাব করা হয়েছে, পরিবর্তনের কারণ কী, কত টাকা ব্যয় হবে—এসব তথ্য মানুষের জানার সুযোগ থাকা উচিত। নকশার ছবি প্রকাশ পেলে আলোচনা আরও নির্দিষ্ট হবে। তখন আপত্তি ও সমর্থন, দুই দিকের কথাই যাচাই করা সম্ভব হবে। জনমত শোনার আয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ধীর করতে পারে, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগও তৈরি করে।
 
স্থানটির পরিচয় ধরে রাখতে ভাস্কর্যের পাশাপাশি তথ্যফলক, মানচিত্র, নির্ভরযোগ্য ছবি ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রয়োজন। সেখানে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থী যেন সহজে জানতে পারে আত্মসমর্পণের তারিখ, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তার সম্পর্ক। শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী তথ্যও রাখা যায়। এসব আয়োজনের মূল কাজ হবে ঘটনাস্থলকে চিনিয়ে দেওয়া। বড় স্থাপনা নির্মাণ করেও যদি মানুষ বুঝতে না পারে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে সংরক্ষণের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা তাই একাধিক। মানুষ সেখানে হাঁটবে, বিশ্রাম নেবে, গাছের ছায়ায় বসবে। একই সঙ্গে ৭ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের নির্দিষ্ট স্থানগুলোর পরিচয় পাবে। এই দুই প্রয়োজন একসঙ্গে মেটানো সম্ভব। ফোয়ারার জন্য উদ্যানের অন্য জায়গা বিবেচনা করা যেতে পারে। আত্মসমর্পণের স্থানটি ঘিরে পরিকল্পনার প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্পষ্ট করে তোলা।
 
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কথা ভাবা দরকার। পাঠ্য বইয়ে একটি ঘটনার তারিখ জানা আর ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে তার পরিসর বোঝা এক অভিজ্ঞতা নয়। শিশুরা অনেক সময় একটি ছবি, স্থাপনা কিংবা সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে আলোচনা শুরু করে। সঙ্গে থাকা বড়দের কাছে জানতে চায়, সেদিন এখানে কারা ছিলেন, কেন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই প্রশ্ন করার সুযোগটি জায়গাটির পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে।
 
উদ্যানের কাজ শেষ হওয়ার পর স্থানটি কে দেখভাল করবে, সেই পরিকল্পনাও এখনই জানানো প্রয়োজন। তথ্যফলকের লেখা পুরোনো হলে তা সংশোধন করতে হবে। স্থাপনার ক্ষতি হলে দ্রুত মেরামত করতে হবে। সন্ধ্যার পর আলো এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে দর্শনার্থী নিরাপদে চলতে পারে এবং ঘটনাস্থলের পরিচয় পড়তে পারে। নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ পেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বছরের পর বছর যত্ন নেওয়ার লোক, অর্থ ও নিয়মিত তদারকির প্রয়োজন। আগের স্থাপনাগুলোর অভিজ্ঞতা দেখে কর্তৃপক্ষ এ কাজের দায়িত্ব কার, তা স্পষ্ট করতে পারে।
 
উদ্যানের পরিকল্পনায় প্রবেশের পথও গুরুত্ব পায়। মূল ফটক থেকে আত্মসমর্পণের স্থান পর্যন্ত পথ নির্দেশনা থাকলে প্রথমবার আসা মানুষ সহজে পৌঁছাতে পারবে। সেখানে পৌঁছে দীর্ঘ বিবরণ পড়ার সময় সবার থাকে না। অল্প কথায় ঘটনাটি জানার সুযোগ রাখতে হবে; আগ্রহী দর্শনার্থীর জন্য বিস্তারিত তথ্যের ব্যবস্থাও করা যায়। ছবি ও তথ্যের উৎস উল্লেখ থাকলে শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেখানে পাঠ আলোচনা করতে পারবেন। তখন উদ্যান ভ্রমণের মধ্যেই ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে কথোপকথন শুরু হবে।
 
এই উদ্যোগে মতামত নেওয়ার সময় কেবল একটি সভা আয়োজন করলেই চলবে না। প্রকাশিত নকশা দেখার পর মানুষ কী বলছেন, কর্তৃপক্ষকে তা লিখিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। কোন পরামর্শ গৃহীত হলো, কোনটি হয়নি এবং কেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ করলে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া পরিষ্কার হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বিবেচনায় তাঁদের বক্তব্য শোনার জন্য সহজ ব্যবস্থা রাখা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, স্থানীয় দর্শনার্থী এবং তরুণ শিল্পীদের মতামতও কাজে লাগতে পারে। এতে নির্মাণ শুরুর আগেই তথ্যগত ভুল ধরা পড়বে, স্থানের ব্যবহার নিয়ে বাস্তব সমস্যাগুলো জানা যাবে।
 
সরকারের কাছে তাই অনুরোধ, প্রকাশিত নথির বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিন এবং আত্মসমর্পণের স্থানে ফোয়ারা বসানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করুন। সংশ্লিষ্ট নকশা ও তথ্য প্রকাশ করুন। মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাসবিদ, শিল্পী এবং সাধারণ মানুষের মতামত নিন। প্রয়োজন হলে ভাস্কর্যের পরিকল্পনা সংশোধন করুন, কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের ঘটনাস্থলকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যাতে সেখানে দাঁড়ানো মানুষ বুঝতে পারে কী ঘটেছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই জায়গা বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক নির্দিষ্ট দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছে। আগামী প্রজন্মের কাছে তার পরিচয় পরিষ্কার রাখা আমাদের দায়িত্ব।
 
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী
 

মন্তব্য করুন

Logo