Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

বিভুরঞ্জন থেকে পুলক: সাংবাদিকের নিঃসঙ্গ জীবনের অদেখা অধ্যায়

ছবিঃ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার (BBC News বাংলা)

মত-দ্বিমত

বিভুরঞ্জন থেকে পুলক: সাংবাদিকের নিঃসঙ্গ জীবনের অদেখা অধ্যায়

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৪ এএম

বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। পাঁচ দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতায় কাটানো একজন মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের আর্থিক অসহায়তা, পেশাগত বঞ্চনা, পরিবারের দুশ্চিন্তা আর চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে যে কথাগুলো লিখে গিয়েছিলেন, সেগুলো সহজে ভুলে থাকার মতো ছিল না। বছর ঘুরতেই ১১ সেপ্টেম্বর বরিশাল থেকে এল আরেকটি দুঃসংবাদ। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি চলে গেলেন। তখন মনে হলো, আমরা কি একজনের পর একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পড়ছি, শোক জানাচ্ছি, তারপর নিজেদের কাজে ফিরে যাচ্ছি?

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর পুলিশ পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করেছে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেসব চিরকুটে স্ত্রী ও মেয়ে, ভাই, সহকর্মী, প্রেসক্লাবের নেতা এবং প্রশাসনের উদ্দেশে কথা লিখে গেছেন তিনি। একটি চিরকুটে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি। অন্য চিরকুটগুলোতে অসুস্থতা, চিকিৎসার ব্যয়, আর্থিক কষ্ট, জীবনের আক্ষেপ এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা অর্থ পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে।

কোনো মানুষের আত্মহননের কারণ একটি বাক্যে লেখা যায় না। একটি চিরকুট দিয়ে তার জীবনের শেষ কয়েক মাস, কয়েক বছর, সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অবস্থা, শারীরিক যন্ত্রণা, পেশাগত হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মনের গভীরে জমে থাকা কষ্টের পূর্ণ চিত্রও পাওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও আত্মহত্যার সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বহু কারণের জটিল সম্পর্কের কথা বলে। জীবিকা হারানো, কর্মক্ষেত্রের চাপ, বৈষম্য, অসুস্থতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, সম্পর্কের সমস্যা ও একাকিত্ব ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই পুলক চ্যাটার্জির একটি বাক্য, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’, পড়ে আমাদের অনুসন্ধান থামিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এখানে ‘দায়ী’ শব্দটির ফৌজদারি অর্থের বাইরে আরেকটি সামাজিক অর্থ আছে। একজন মানুষ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে চিকিৎসা চালানোর সামর্থ্য তার ছিল কি না, চাকরি হারানোর পর তার আয় কতটা কমেছিল, পাওনা অর্থ পেতে সমস্যা হয়েছিল কি না, পেশাগত পরিচয় হারিয়ে তিনি কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন, পরিবার ও সহকর্মীরা তাঁর মানসিক অবস্থার গভীরতা বুঝতে পেরেছিলেন কি না, এসব জানা দরকার। তদন্ত মানে কাউকে অপরাধী বানানো না। তদন্তের একটি বড় কাজ মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া পরিস্থিতিগুলো বোঝা, যাতে আরেকজন মানুষকে হারানোর আগে পাশে দাঁড়ানো যায়।

বিভুরঞ্জন সরকারের ঘটনা এই আলোচনাকে আরও ভারী করে তোলে। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিনি একটি সংবাদমাধ্যমে ‘খোলা চিঠি’ পাঠিয়েছিলেন। পরদিন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়। শেষ লেখায় নিজের আর্থিক দৈন্য, নিজের ও ছেলের অসুস্থতা, সন্তানদের কর্মজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা, পেশাগত বঞ্চনা এবং সাংবাদিকতা করতে গিয়ে চাপের কথা লিখেছিলেন। সেখানে তাঁর একটি বাক্য ছিল, ‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।’ 

বাক্যটি শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত হতাশার মধ্যে আটকে থাকে না। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের দিকে তাকালে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও সামনে আসে। চলতি সেপ্টেম্বরেই সাংবাদিক নেতারা দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মধ্যে বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখনও ২০১৯ সালে ঘোষিত নবম ওয়েজ বোর্ড পুরোপুরি কার্যকর করেনি। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীও জুলাইয়ে সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করা, যথাযথ বেতন এবং চাকরির স্থায়িত্বের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। 

একজন সাংবাদিকের পেশাগত পরিচয়ের ভেতরে তাই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। সারাজীবন তিনি অন্য মানুষের অন্যায়, বঞ্চনা, চাকরি হারানো, চিকিৎসার অভাব, অধিকারহানি নিয়ে লিখেছেন। একদিন নিজের জীবনে একই ধরনের চাপ এসে দাঁড়ালে তিনি হয়তো বুঝতে পারেন, অন্যের জন্য যে সামাজিক সহায়তার কথা লিখেছেন, নিজের জন্য তার নাগাল পাওয়া কঠিন। বিভুরঞ্জন সরকার ও পুলক চ্যাটার্জির রাজনৈতিক চিন্তা, ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক অবস্থা, শারীরিক অবস্থা এবং মৃত্যুর আগের মানসিক অবস্থাকে একই ছাঁচে ফেলা যাবে না। দুই মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক কার্যকারণ প্রতিষ্ঠার মতো তথ্যও আমাদের হাতে নেই। তবু তাঁদের মৃত্যু পাশাপাশি রেখে বাংলাদেশের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তার মানুষের বর্তমান মানসিক অবস্থার একটি দিক নিয়ে কথা বলা দরকার।

গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক পালাবদল, সামাজিক মেরুকরণ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে উদ্বেগ, মতপ্রকাশ ঘিরে ভয়, মব সন্ত্রাস, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং অনলাইনে আক্রমণ অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর বহু হামলা, লেখকদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঘিরে আইনি উদ্বেগের কথা এসেছে। 

প্রগতিশীল মানুষের মানসিক ট্রমার আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে জরুরি। রাজনৈতিক পরাজয়, সামাজিক পরিবর্তন কিংবা নিজের চিন্তার বিপরীতে কোনো শক্তির উত্থান নিজে আত্মহত্যার ব্যাখ্যা হতে পারে না। এমন সরল সমীকরণ বিপজ্জনক। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচিত সামাজিক পরিসর বদলে যাওয়া, নিজের কথা প্রকাশে ভয়, বন্ধুদের ছড়িয়ে পড়া, চাকরির অনিশ্চয়তা, বয়স, অসুস্থতা, অর্থকষ্ট এবং নিজের সামাজিক ভূমিকা হারানোর অনুভূতি একসঙ্গে একজন মানুষকে গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তখন রাজনৈতিক হতাশা ব্যক্তিগত হতাশার সঙ্গে মিশে যায়। কোনটি কোথায় শেষ হচ্ছে, মানুষ নিজেও অনেক সময় আলাদা করতে পারেন না।

এই জায়গায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মৃত্যুর পর পুলিশি তদন্তে সীমিত থাকতে পারে না। বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধকে জনস্বাস্থ্য নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, বাংলাদেশে ২০২১ সালে আনুমানিক ৪ হাজার ৭১৪ জন আত্মহত্যায় মারা গেছেন, দিনে গড়ে প্রায় ১৩ জন। একই সঙ্গে দেশে ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের বহুখাতভিত্তিক জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। পরিকল্পনাটির মধ্যে কর্মজীবী মানুষের মানসিক সহায়তা আলাদা গুরুত্ব পাওয়া দরকার। সংবাদকর্মীদের জন্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে গোপনীয় কাউন্সেলিং, চাকরি হারানো কর্মীদের জরুরি সহায়তা, বকেয়া বেতন ও পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসা সহায়তা এবং সহকর্মীদের মধ্যে ঝুঁকির লক্ষণ চিনতে প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক চাকরি হারানোর পরও সাংবাদিক সমাজেরই মানুষ থাকেন। তাঁর প্রেসকার্ডের মেয়াদ শেষ হতে পারে, মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় না।

আরেকটি দায়িত্ব সাংবাদিকদের নিজেদের। আত্মহত্যার সংবাদকে আবেগময় গল্পে পরিণত করার মধ্যে বিপদ আছে। WHO সতর্ক করেছে, আত্মহত্যার পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ, অতিরিক্ত প্রচার, রোমান্টিক উপস্থাপন এবং একটি নির্দিষ্ট সমস্যাকে মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে তুলে ধরা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সংবাদে সহায়তা পাওয়ার পথ এবং বিপর্যয় কাটিয়ে ফিরে আসা মানুষের অভিজ্ঞতাও জায়গা পাওয়া দরকার। 

বিভুরঞ্জন সরকারের শেষ লেখা আমরা পড়েছি। পুলক চ্যাটার্জির পাঁচটি চিরকুট নিয়েও আলোচনা চলছে। তাঁদের লেখা নিয়ে কৌতূহলের চেয়ে বেশি দরকার জীবিত মানুষগুলোর দিকে তাকানো। আমাদের আশপাশে হয়তো এমন সাংবাদিক আছেন যাঁর কয়েক মাসের বেতন বাকি। কেউ চাকরি হারিয়ে পরিচিত মহলে আসা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ দীর্ঘদিন অসুস্থ, চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে নিজেকে ক্রমে একা ভাবছেন। কেউ প্রতিদিন সবার সঙ্গে কথা বলছেন, অথচ নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলছেন না। রাষ্ট্রের অনুসন্ধান সেখান থেকেই শুরু হওয়া দরকার। শুধু কে মারা গেলেন, কী লিখে গেলেন, তার অনুসন্ধান যথেষ্ট নয়। খুঁজতে হবে, জীবিত অবস্থায় তিনি কোথায় সহায়তা চেয়েছিলেন, কোথায় পাননি, কোন প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারত, কারা তাঁর কষ্ট বুঝতে পারেনি। 

বিভুরঞ্জন সরকার চলে গেছেন। পুলক চ্যাটার্জিও চলে গেলেন। তাঁদের মৃত্যুকে কোনো রাজনৈতিক মতের পক্ষে ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি আরেকজন বিভুরঞ্জন, আরেকজন পুলককে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া। মানুষটি যখন এখনও আমাদের পাশে বসে চা খাচ্ছেন, সংবাদ লিখছেন, সম্পাদনা করছেন, তর্ক করছেন, হাসছেন, তখনই তাঁকে জিজ্ঞেস করা দরকার, ‘আপনি কেমন আছেন?’ কখনো কখনো এই ছোট বাক্যটির উত্তর মন দিয়ে শোনাই একটি জীবনকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে।


মন্তব্য করুন

Logo