ছবিঃ The Daily Star বাংলা
হুতি-ইসরায়েল গোপন আঁতাত!
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই চলছে সৌদি আরবের। এ লড়াইয়ে সৌদি আরবকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু সৌদি যুবরাজ সে প্রস্তাবে রাজী হননি।
১২ অক্টোবর ইসরায়েলি পত্রিকা 'হারেৎস' একটি অত্যন্ত বিস্ফোরক খবর প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলকে অংশী করতে আমেরিকার মধ্যস্থতায় জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সেই প্রস্তাব সটান নাকচ করে দিয়েছেন।
এদিকে ইসরায়েলের আরেক দৈনিক 'য়েদিওথ আহরোনথ' বলছে যে, হুথিদের ওপর আকস্মিক বিমান হামলা চালানোর সম্ভাব্যতার কথা ইসরায়েলি সেনাপ্রধানের সাথে আলোচনা করেছে আমেরিকা। কিন্তু ওই হামলা চালাতে সাফ মানা করে দিয়েছে তারা। কারণ তারা সতর্ক করে বলেছে যে, এই ধরনের হামলা চালালে পরিস্থিতি এমন এক উত্তেজনার দিকে মোড় নিতে পারে যা শেষ পর্যন্ত এমনকি ইরানকেও জড়িয়ে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, আগামী ১৫ নভেম্বরে নির্ধারিত ইসরায়েলি নির্বাচনকেও পেছাতে বাধ্য করতে পারে। বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা দরকার।
আমেরিকা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে না, কারণ তারা বুঝতে পেরেছে নির্বাচনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো দরকার। একই সাথে, ইসরায়েলকে এই ময়দানে নামানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- নেতানিয়াহুর কাছে আসলে কেন সৌদি আরবের অনুমতি এত জরুরি?
মন চাইলে সৌদির গ্রিন সিগন্যাল বা অনুমতি ছাড়া হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে পারে ইসরায়েল। অতীতে বেশ কয়েকবার হুথিদের উপর হামলা করেছিল ইসরায়েল, যখন সৌদি বা অন্য কোনো আরব দেশকে জানানোর প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, নেতানিয়াহুর লক্ষ্য হুথি ঘাঁটিতে বোমা হামলার চেয়েও অনেক বড় কিছু।
প্রথমত, রিয়াদের সম্মতির ছাপ গায়ে লাগিয়ে হুথি সংঘাতে প্রবেশ করতে চান নেতানিয়াহু। এটি যদি সৌদি আরব থেকে আসে, তবে ইসরায়েলের এই সামরিক পদক্ষেপটি আর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হামলা বা অপারেশন থাকবে না। বরং এটিকে বিশ্বের সামনে একটি যৌথ অভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় আরব ও মুসলিম বিশ্বের কোনো বড় দেশের সাথে ইসরায়েলের অংশীদারিত্ব হিসেবে জাহির করা যাবে।
আর নেতানিয়াহুর জন্য এটি হবে একটি বিশাল রাজনৈতিক জয়। কারণ এর মাধ্যমে তিনি আরব-ইসরায়েল নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের একটি ডিসপ্লে করতে চান। সৌদি আরব নিজে থেকে সেই অংশীদারিত্বে অংশ নিতে চাচ্ছে না। কিন্তু আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইসরায়েল থেকে বারবার সেই বার্তা আসছে।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের নির্বাচন!
একটু খেয়াল করুন, পরিস্থিতি বেশি উত্তপ্ত হলে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা কিন্তু ইসরায়েলি সেনাপ্রধান বলেছেন। আর ঠিক এখানেই একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে: ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে নিজেকে নিরাপদ নেতা হিসেবে তুলে ধরতে এবং ইসরায়েলিদের সামনে নতুন আরব মিত্র (এক্ষেত্রে সৌদি আরব) উপস্থাপন করতেই কি ইয়েমেনের এই সামরিক সংঘাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান নেতানিয়াহু?
কিংবা নির্বাচন পেছানোর পথ পাকা করতেই কি এই আঞ্চলিক যুদ্ধকে একটি বড় মাত্রার সংঘাতে রূপ দেওয়া হচ্ছে?
তৃতীয় দিকটি কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য, আরব বিশ্বের জন্য এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক মনে হয়। এটা হলো আরব-ইসরায়েলি নর্মালাইজেশন এবং আইএমইসি (IMEC) প্রজেক্ট: এই সেই প্রজেক্ট—যা ট্রাম্পের আগের মেয়াদে যখন তার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির খুব বন্ধুত্ব ছিল এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলছিল, ঠিক সেই সময় নেতানিয়াহুর সঙ্গে পরামর্শ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইন্ডিয়ার প্রভাব বাড়াতে মোদির তরফ থেকে তা উপস্থাপন করা হয়েছিল। এতে ইন্ডিয়া থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বন্দর ও রেলওয়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথা রয়েছে, যা মূলত জর্ডান এবং ইসরায়েলের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিকল্প হিসেবেও আমেরিকার কাছে আইএমইসি অর্থাৎ ইন্ডিয়া মিডল ইস্ট ইকোনমিক করিডরকে-কে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন মোদি। এখন, হুথিদের উপর হামলার আগ্রহ নিজে থেকে প্রকাশ করে সেইজন্য আবার সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের শর্ত দেয়ার অর্থ হলো, রিয়াদের সাথে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার রাস্তা তৈরি করা। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে আবার চাঙ্গা করতে চান নেতানিয়াহু, যার চূড়ান্ত রূপ হতে পারে আইএমইসি করিডোরের মতো বড় কোনো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রকল্প।
চতুর্থ দিকটির দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিন
সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে হুথি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে চায় ইসরায়েল। একেই বলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার। সৌদি আরবের ওপর হুথিদের এই চাপকে কাজে লাগিয়ে রিয়াদের কাছে নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতার অপরিহার্যতা তুলে ধরতে চাইনে নেতানিয়াহু।
কারণ প্রকাশ্যেই হোক আর অন্তরালেই হোক, এই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য হুথিদের কাছে গোপন চ্যানেলে ঠিকই সাহায্য পৌঁছাচ্ছে। এমনকি মিডিয়ার দিক থেকেও যদি তাকান, হুথিদের পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং তাদের বার্তাগুলো কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে এমন কিছু দেশের হাত রয়েছে—যাদের সমর্থন মিডিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি শত্রুতায় রূপ নেয়।
দখলদার বাহিনী এবং তাদের অংশীদারদের মূল উদ্দেশ্য এটাই। ঠিক যে মুহূর্তে সৌদি যুবরাজ নেতানিয়াহুকে বলবেন, "ময়দানে আপনাকে স্বাগতম", ঠিক তখনই মিডিয়া, অর্থ এবং রাজনৈতিক গোয়েন্দা তৎপরতা হুথিদের মদদ দেওয়া থেকে সরে দাঁড়াবে এবং উল্টো তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। আর সেই মুহূর্তেই হুথিরা খুব কম সময়ের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। হ্যাঁ, এটাই হলো হুথি-ইসরায়েলের গোপন আঁতাত! প্রতিটি হুথি রকেট আসলে ইসরায়েলের নামেই ছোড়া হয়, আর সৌদি আরবের ওপর চালানো প্রতিটি হামলাও আসলে হুথিদের আড়ালে ইসরায়েলেরই কাজ—সবকিছুই সাজানো, এর বাইরে আর কিছু নয়। কিন্তু সৌদি আরব বারবার কড়া ভাষায় না করে দিচ্ছে!
আর এই "না" কেবল ইসরায়েলিদের হুথিদের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা নয়... এটি বরং রিয়াদের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর যেকোনো ফন্দি-ফিকির, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সমস্ত আয়োজন এবং মধ্যপ্রাচ্যে নেতানিয়াহুর মোড়ল হয়ে ওঠার সব আশাকে একেবারে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া।
রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের ফল্ট কম না। ব্যক্তি হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমানের ফল্টও কম না। হুথিদের সঙ্গে সৌদিদের যুদ্ধও নতুন ঘটনা না। কিন্তু হঠাৎ করে হুথিদের গায়ে এতো কারেন্ট বেড়ে যাওয়া অথবা ইরানের কাছে নেই এমন সিস্টেমও তাদের হাতে পৌঁছে যাওয়া -- উদ্দেশ্য একটাই। ওদেরকে দিয়ে সৌদি আরবকে এমন চাপে ফেলা যাতে সৌদিরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাধ্য হয়, এরপর হুথিবিরোধী অভিযানে সহযোগিতার অজুহাতে সৌদি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা ও অস্ত্র নামানো (কয়দিন আগে ফ্লাইদুবাই নাটকের মাধ্যমে একবার চেষ্টা করেছিল ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের তাবুক থেকে নেয়ার অজুহাতে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান পাঠাতে) এবং ধীরে ধীরে ইন্ডিয়ার প্রস্তাবিত আইএমইসি করিডোর থেকে শুরু করে ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক প্রকল্পগুলো মিডল ইস্টের মাটিতে রূপায়ণ করা।
মন্তব্য করুন

