ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
আইনজীবীর গ্রেপ্তার ও নাগরিকের অধিকার
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম
জিয়াউল ইসলাম কাজলের গ্রেপ্তারের সংবাদ পড়ে আমার মনে প্রথমে এসেছে আদালতে আশ্রয় খুঁজতে যাওয়া মানুষের কথা। একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের অভিযোগের মুখোমুখি দাঁড়ান, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য একজন আইনজীবী প্রয়োজন হয়। সেই আইনজীবীও যদি মক্কেলের পক্ষে কাজ করার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার কতটা কার্যকর থাকে? নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনা আমাকে এই উদ্বেগের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কাজলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর পেশাগত দায়িত্বের প্রসঙ্গ তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর আইনজীবী, আবৃত্তিশিল্পী ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল, তাঁর ভাই নাট্যকর্মী আতিকুল ইসলাম মুন্না এবং আইনজীবী মাহাবুব রহমানকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছে। আগের দিন আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে উপস্থিত ব্যক্তিদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনার পর এই গ্রেপ্তার ঘটে। কাজল স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করার কথা বলেছেন। পুলিশের বক্তব্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে স্লোগানের অভিযোগ এসেছে। এই দুই বক্তব্যের পার্থক্য নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।
এখানে প্রথমেই অভিযোগের নির্দিষ্টতা নিয়ে কথা বলতে হবে। তিনজনের প্রত্যেকে কী করেছেন, কোন ঘটনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ধারায় কী উপাদান রয়েছে, তা পৃথকভাবে জানাতে হবে। একই স্থানে উপস্থিত ছিলেন বলেই সবাই অপরাধে জড়িত ছিলেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না। একজনের উচ্চারণের দায় অন্যজনের ওপর চাপানোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মামলার পূর্ণ নথি সামনে নেই বলে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সংগত হবে না। তবে প্রকাশিত তথ্য প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে।
আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতা ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া, জামিন চাওয়া, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের অসংগতি তুলে ধরা তাঁর কাজ। মক্কেলের রাজনৈতিক মতের সঙ্গে তাঁর নিজের মতের মিল থাকা বাধ্যতামূলক কিছু হতে পারে না। পেশাগত প্রতিনিধিত্বের কারণে আইনজীবীকে মক্কেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ ধরে নিলে আদালতে প্রতিরক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়। তখন আলোচিত মামলায় দায়িত্ব নেওয়ার আগে অন্য আইনজীবীরাও নিজের নিরাপত্তার হিসাব করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত হন আইনি সহায়তাপ্রার্থী মানুষ। জাতিসংঘের আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত মূলনীতির ১৬ নম্বর নীতিতে ভীতি, বাধা, হয়রানি ও অনুচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে পেশাগত কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। ১৮ নম্বর নীতিতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সূত্রে আইনজীবীকে তাঁর মক্কেল ও মক্কেলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এক করে চিহ্নিত করার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান আছে। এসব নীতি আইনজীবীদের ব্যক্তিগত অপরাধের তদন্ত থেকে অব্যাহতি দেয় না। তবে তদন্তের জন্য তাঁদের নিজস্ব কার্যকলাপের সঙ্গে অভিযোগের সম্পর্ক থাকতে হবে। মক্কেলের পরিচয় সেই সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।
জিয়াউল ইসলাম কাজল দেশের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী। তিনি আটক থাকায় মামলার আইনি প্রস্তুতি ও পরিচালনায় কী ধরনের অসুবিধা তৈরি হতে পারে এবং ত্বকীর পরিবার কতটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে, সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল্যায়ন হবে আলাদাভাবে। পাশাপাশি চলমান মামলায় তাঁর মক্কেলদের প্রয়োজনীয় নথি ও আইনি সহায়তা পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। একটি গ্রেপ্তারের প্রভাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাইরেও ছড়াতে পারে।মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত একটি স্লোগান। কোনো রাজনৈতিক দল একটি স্লোগান ব্যবহার করে বলেই, অন্য কেউ সেই স্লোগান দিলে তাঁকে ওই দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত ধরে নেওয়া যুক্তিসংগত হবে না। পুলিশ যদি কারও বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আনে, তাহলে কোন পরিস্থিতিতে কে স্লোগান দিয়েছেন, সেখানে তাঁর ভূমিকা কী ছিল এবং তাঁর কাজ আইনের কোন নির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তা স্পষ্ট করতে হবে। কারও বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ হলেই তাকে অপরাধ বলা যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা আছে। আইন আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে অধিকার প্রয়োগের সীমা নিয়ে আলোচনা করতে হলে সেই বিধিনিষেধের আইনগত কারণ জানাতে হবে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের ১৯ অনুচ্ছেদও মতপ্রকাশের ওপর বাধাকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তার শর্তে বিবেচনা করে। জননিরাপত্তার কথা উচ্চারণ করলেই কোনো হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। কী বিপদ ঠেকাতে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা থাকতে হবে; ব্যবস্থার মাত্রাও সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
গ্রেপ্তার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত করে। কাজ বন্ধ হয়, পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে, সামাজিক অপবাদ তৈরি হয়। পরে অভিযোগ টিকতে না পারলেও হারানো সময় ফিরে আসে না। তাই তদন্তের সুবিধার সাধারণ যুক্তি দিয়ে স্বাধীনতা হরণের সিদ্ধান্তকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যাখ্যা করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক রাখার বাস্তব প্রয়োজন কোথায়। হাজিরার শর্তে মুক্ত রেখে তদন্ত চালানোর সুযোগও আদালতের বিবেচনায় আসা উচিত।সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ গ্রেপ্তারের কারণ দ্রুত জানানো এবং পছন্দের আইনজীবীর পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়ার সুরক্ষা দেয়। আন্তর্জাতিক সনদের ৯ অনুচ্ছেদ খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার ও আটক নিষিদ্ধ করে; বিচারাধীন ব্যক্তিকে আটক রাখাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করে না। আদালতে হাজির করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও আটক রাখার যথার্থতা যাচাইয়ের দায় শেষ হয় না। ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আদালতের স্বাধীন মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। কোন তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশি হেফাজত চাওয়া হচ্ছে? সেই তথ্য নথি পরীক্ষা, ভিডিও বিশ্লেষণ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদা কারণ উপস্থাপন করতে হবে। অভিযোগের গুরুত্ব দিয়ে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবেদন গ্রহণের আগে আদালতের কাছে সুনির্দিষ্ট যুক্তি থাকা চাই। হেফাজতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিঃশর্ত। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনজীবীর সহায়তা পান এবং আইন অনুযায়ী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ; ভয় সৃষ্টি করে বক্তব্য আদায়ের সুযোগ সেখানে থাকতে পারে না। নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে দ্রুত স্বাধীন অনুসন্ধান এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের বিবৃতিতে জিয়াউল ইসলাম কাজল ও আতিকুল ইসলাম মুন্নার জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কথা এসেছে। তাঁদের সহকর্মীদের উদ্বেগ গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষার যুক্তিকে কারও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল করা অনুচিত। আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ এবং অংশ না নেওয়া মানুষ সমান আইনি সুরক্ষা পাবেন। আইনজীবী সমিতিগুলোরও দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা উচিত। আজকের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার অক্ষত রাখার মধ্যেই আগামী দিনে নিজের নিরাপত্তাও সুরক্ষিত হবে।
সংবাদমাধ্যমেরও এখানে দায়িত্ব আছে। পুলিশের অভিযোগ প্রকাশের সঙ্গে অভিযুক্তদের জবাব সমান গুরুত্বে তুলে ধরতে হবে। গ্রেপ্তারের সংবাদে এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত, যাতে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই জনগণ কাউকে অপরাধী মনে না করেন। আবার পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি সহমর্মিতা থেকে অভিযোগের তথ্য উপেক্ষা করাও সংগত হবে না। মামলার ধারা, ঘটনার সময়, গ্রেপ্তারের কারণ ও আদালতের আদেশ নির্ভুলভাবে প্রকাশ করলে নাগরিকেরা প্রশাসনের পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে পারেন। অসম্পূর্ণ ভিডিও এবং রাজনৈতিক মন্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদ তৈরি হলে উত্তেজনা বাড়ে, তথ্য হারিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ, আইনজীবীদের ব্যাখ্যা নেওয়া এবং পুলিশের কাছে নির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখার কাজ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। মুক্তি পেলে সেই সংবাদও গ্রেপ্তারের সংবাদের মতো গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ণ করার পর একটি সংশোধনীতে সংবাদমাধ্যমের দায় শেষ হতে পারে না। তথ্য প্রকাশের প্রতিটি পর্যায়ে সংযম ও সতর্কতা চাই।
এখন প্রয়োজন আদালত প্রাঙ্গণের ভিডিও সংরক্ষণ, গ্রেপ্তারের কারণ ও মামলার সংশ্লিষ্ট নথি আদালতে উপস্থাপন এবং প্রত্যেকের ভূমিকার পৃথক মূল্যায়ন। বাছাই করা দৃশ্য দিয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা বন্ধ রাখতে হবে। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট উপাদান অনুপস্থিত থাকলে তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হোক। পেশাগত কাজ ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের কারণে হয়রানির তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আদালতে প্রত্যেক মানুষের নিজের পক্ষে কথা বলার জন্য আইনজীবী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেই আইনজীবীও যেন নির্ভয়ে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
মন্তব্য করুন

