Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

মাদক বাণিজ্যের অর্থায়ন ও সন্ত্রাসবাদ

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

কাভার স্টোরি- ইন ডেপথ

মাদক বাণিজ্যের অর্থায়ন ও সন্ত্রাসবাদ

Icon

সুমিত রায়

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় সশস্ত্র বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী দলগুলোর অর্থায়নের উৎস ছিল স্পষ্ট। কোনো না কোনো পরাশক্তি বা তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলো মতাদর্শের নামে এই দলগুলোকে অর্থ, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করত। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির চিত্রপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রায় রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সামনে টিকে থাকার অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়। ঠিক এই সংকটময় সন্ধিক্ষণেই অপরাধ জগৎ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ গবেষক তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) ২০০৪ সালে এই রূপান্তরকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন তার বহুল আলোচিত অপরাধ-সন্ত্রাস অবিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব (Crime-Terror Continuum Theory)-এর মাধ্যমে (Makarenko, 2004)।

মাকারেঙ্কোর তত্ত্বের মূল কথা হলো, অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদকে আর দুটি পৃথক দ্বীপে বাস করা সত্তা হিসেবে দেখা যায় না। এক প্রান্তে অবস্থান করে নিখাদ সংগঠিত অপরাধ চক্র, যাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে আর্থিক মুনাফা অর্জন। অন্য প্রান্তে থাকে বিশুদ্ধ মতাদর্শিক সন্ত্রাসী দল, যাদের লক্ষ্য রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ক্ষমতার পরিবর্তন। অতীতে এই দুই দল একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখত। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের মধ্যে প্রথমে কৌশলগত মৈত্রী তৈরি হয়। সন্ত্রাসীদের অর্থের প্রয়োজন ছিল, আর অপরাধীদের প্রয়োজন ছিল অস্ত্রের বল এবং সামরিক সুরক্ষা। মাকারেঙ্কো দেখান যে এই সহযোগিতা ধীরে ধীরে এমন এক স্তরে পৌঁছায় যাকে বলা হয় রূপান্তর। অর্থাৎ একসময় সন্ত্রাসী দলটি নিজেই মাদক চোরাচালানের সিন্ডিকেটে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক আদর্শ কেবল তাদের বাহ্যিক প্রচারণার মুখোশ হিসেবে অবশিষ্ট থাকে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ক্রিস ডিশম্যান (Chris Dishman) এই রূপান্তরকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন (Dishman, 2001)। ডিশম্যান দেখান যে কীভাবে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের মূল লক্ষ্যও বদলে যায়। একে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন মতাদর্শিক রূপান্তর (Ideological Transformation) হিসেবে। পুরোনো দিনের আদর্শবাদী নেতারা যখন সামরিক অভিযানে নিহত বা গ্রেপ্তার হন, তখন দলের ভেতরে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসে সেই সব কমান্ডার যারা মাঠে থেকে লজিস্টিকস এবং মাদক অর্থায়ন পরিচালনা করত। এই নতুন প্রজন্মের নেতাদের কাছে বিপ্লব বা স্বাধীনতার স্বপ্ন গৌণ হয়ে পড়ে; প্রধান হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবন এবং মাদক সাম্রাজ্যের কোটি কোটি ডলারের ভাগ নিশ্চিত করা।

এই অপরাধ-সন্ত্রাস মিথোজীবিতা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। প্রচলিত সামরিক কৌশল দিয়ে এই সংকর ধরণের হুমকি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র বুঝতে পারে না সে কি কোনো রাজনৈতিক বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ করছে, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক ড্রাগ কার্টেলের মোকাবেলা করছে। রাজনৈতিক দাবি মেনে নিলেও এরা যুদ্ধ বন্ধ করতে চায় না, কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে এই লাভজনক অবৈধ মাদক বাণিজ্যের মৃত্যু ঘটবে। ফলে এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা পুরো সংঘাতকে এক অন্তহীন সহিংসতার ফাঁদে বন্দি করে ফেলে, যা সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিঃশেষ করে দেয়।

গৃহযুদ্ধের অর্থনীতি: লোভ বনাম ক্ষোভের বিতর্ক

কেন মানুষ নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়? মানুষ কি সামাজিক অন্যায়, বৈষম্য এবং বঞ্চনার ক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ করে, নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে লুটপাটের অর্থনৈতিক সুযোগ পেয়ে অপরাধের পথে নামে? এই মৌলিক প্রশ্নটি নিয়ে বিশ শতকের শেষে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এক তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ার এবং আঙ্কে হোয়েফলার ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাংকের এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে হাজির করেন তাদের যুগান্তকারী স্বার্থপরতা বনাম ক্ষোভ তত্ত্ব (Greed versus Grievance Theory) (Collier & Hoeffler, 2004)। কোলিয়ার তার গবেষণায় যুক্তি দেন যে গৃহযুদ্ধের শুরু বা টিকে থাকার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ বা বঞ্চনার চেয়েও অনেক বেশি ভূমিকা পালন করে বিদ্রোহীদের অর্থনৈতিক সুযোগ বা লোভ।

কোলিয়ারের মতে, যে সমস্ত অঞ্চলে সহজেই লুটপাট বা কর আদায় করা যায় এমন প্রাকৃতিক সম্পদ থাকে - যেমন হীরা, কাঠ বা অবৈধ মাদক - সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। কোকা পাতা বা আফিম পপি হলো এই ধরণের সবচেয়ে আদর্শ পণ্য। কারণ এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপন্ন হয়, পরিবহন করা সহজ এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এর দাম থাকে অবিশ্বাস্যরকম বেশি। বিদ্রোহীরা যখন এই মাদক অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তখন তাদের আর সাধারণ জনগণের কাছ থেকে চাঁদা তোলার ওপর নির্ভর করতে হয় না। তারা পপি চাষি এবং চোরাকারবারিদের ওপর কর বসিয়ে নিজেরাই এক স্বয়ংসম্পূর্ণ যুদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেরেমি এম. ওয়াইনস্টাইন (Jeremy M. Weinstein) ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ইনসাইড রিবেলিয়ন (Inside Rebellion)-এ এই বিদ্রোহী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন (Weinstein, 2007)। ওয়াইনস্টাইন দেখিয়েছেন যে তহবিলের উৎস কীভাবে একটি বিদ্রোহী দলের পুরো মানসিকতা গড়ে দেয়। যেসব দল নিজেদের টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছা অনুদান এবং সামাজিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে, তারা তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল থাকে এবং সাধারণ মানুষের ওপর কম অত্যাচার চালায়। কিন্তু যে দলগুলোর হাতে মাদক অর্থনীতির মতো সহজ নগদ অর্থের প্রবাহ চলে আসে, তারা খুব দ্রুত পরিণত হয় সুবিধাবাদী বিদ্রোহীতে।

ওয়াইনস্টাইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাদক অর্থে পুষ্ট এই সুবিধাবাদী বিদ্রোহী দলগুলোতে আদর্শবান বিপ্লবীদের বদলে ভিড় জমায় সমাজের সুবিধাবাদী অপরাধী, বেকার গুণ্ডা এবং অর্থলোভী যুবকেরা। এদের নিয়ন্ত্রণে কোনো নৈতিক অনুশাসন থাকে না। তারা ক্ষমতার লোভে যেকোনো ধরণের বর্বরতা চালাতে প্রস্তুত থাকে। ফলে মাদক অর্থায়নে পরিচালিত গৃহযুদ্ধগুলোতে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেশি ঘটে। বিদ্রোহের মূল রাজনৈতিক বক্তব্য হারিয়ে গিয়ে পুরো আন্দোলনটি পরিণত হয় অস্ত্রের মুখে মাদক বাণিজ্য পরিচালনার এক হিংস্র কর্পোরেশনে। অর্থনীতি এভাবেই একটি আদর্শিক লড়াইয়ের আত্মাকে গ্রাস করে ফেলে।

মাদক অর্থায়ন ও নতুন যুদ্ধ: রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতা

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সমাজবিজ্ঞানী মেরি কালডোর (Mary Kaldor) বিংশ শতাব্দীর শেষের সংঘাতগুলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাজির করেন তার বিখ্যাত নতুন যুদ্ধ তত্ত্ব (New Wars Theory) (Kaldor, 2012)। কালডোর দেখিয়েছেন যে অতীতের পুরনো যুদ্ধগুলো পরিচালিত হতো দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে, যেখানে নির্দিষ্ট রণাঙ্গন থাকত এবং লক্ষ্য থাকত ভূখণ্ড দখল। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধোত্তর যুগে যে নতুন যুদ্ধগুলো শুরু হয়েছে, তা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধগুলো পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক মিলিশিয়া, ভাড়াটে সৈন্য এবং স্থানীয় গ্যাংগুলোর মধ্যে এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নতুন যুদ্ধের প্রধান জ্বালানি হলো রাষ্ট্রের ওপর বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যাওয়া এবং একটি হিংস্র সমান্তরাল যুদ্ধ অর্থনীতির বিকাশ।

মাদক অর্থায়ন হলো এই নতুন যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে নিখুঁত মাধ্যম। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, সেখানেই এই সংঘাতের বিস্তার ঘটে। সুইডিশ নিরাপত্তা গবেষক সভান্তে ই. কর্নেল (Svante E. Cornell) ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার সংঘাতগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে মাদক বাণিজ্য কীভাবে যুদ্ধের সময়কালকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয় (Cornell, 2007)। কর্নেল একে চিহ্নিত করেছেন সংঘাত প্রলম্বন গতিবিদ্যা (Conflict Prolongation Dynamics) হিসেবে। কোনো শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সব যুদ্ধবাজ কমান্ডাররা, যারা যুদ্ধের অরাজকতার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকার মাদক চালান পরিচালনা করছিল। ফলে যখনই শান্তি আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়, এই কমান্ডাররা কোনো না কোনো উস্কানিমূলক হামলা চালিয়ে পুনরায় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়।

এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটি ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী, সীমান্তরক্ষী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিদ্রোহীদের অস্ত্রের ভয়ে নয়, বরং মাদক চক্রের দেওয়া ঘুষের লোভে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। একসময় যে রাষ্ট্রটি বিদ্রোহ দমনের দায়িত্বে ছিল, সেই রাষ্ট্রের সেনাপতিরাই পরোক্ষভাবে মাদক রুটগুলো পাহারা দিতে শুরু করে। ফলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক চিরস্থায়ী নৈরাজ্যের জন্ম হয়। আফগানিস্তান, সোমালিয়া বা গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে আমরা এই ধরণের সংঘাতের অনন্ত চক্র দেখতে পাই।

নতুন যুদ্ধের এই অর্থনীতি সাধারণ সমাজকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়। খাদ্য শস্যের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সাধারণ মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অথচ সংঘাতের মূল কুশীলবরা - সেই যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত জেনারেলরা - আন্তর্জাতিক মাদক পাইপলাইন থেকে আসা মুনাফায় নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সমৃদ্ধ করে চলে। সহিংসতা সেখানে কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সংকট থাকে না; এটি পরিণত হয় একটি লাভজনক পেশায়, যার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর একমাত্র অভিন্ন উদ্দেশ্য।

আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক ও মাদক বাণিজ্যের অর্থায়ন 

মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে গত কয়েক দশকে যেসব চরমপন্থী ধর্মীয় সশস্ত্র নেটওয়ার্কের উত্থান ঘটেছে, তাদের আর্থিক খতিয়ান পরীক্ষা করলে এক চরম দ্বিচারিতা চোখে পড়ে। প্রকাশ্য বক্তৃতায় এই দলগুলো মাদক সেবন ও কারবারকে চরম পাপ ও অনৈতিক কাজ বলে তীব্র ভাষায় নিন্দা করে থাকে। কিন্তু পর্দার আড়ালে নিজেদের অস্ত্র কেনার তহবিল সংগ্রহের জন্য তারা এই মাদক বাণিজ্যের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে। মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক গ্রেচেন পিটার্স (Gretchen Peters) ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ সিডস অব টেরর (Seeds of Terror)-এ আফগানিস্তানের যুদ্ধের গভীরে প্রবেশ করে এই তথ্য উন্মোচন করেছিলেন (Peters, 2009)।

পিটার্স তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে তালেবান এবং আল-কায়েদার নেতৃত্ব আফিম পপি চাষের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন সন্ত্রাসবাদী অর্থায়ন ব্যবস্থা (Terrorist Financing System) হিসেবে। তালেবানরা কেবল চাষিদের কাছ থেকে ফসলের ওপর ধর্মীয় কর আদায় করত না; তারা সরাসরি কাঁচা আফিম থেকে হেরোইন তৈরির ল্যাবরেটরিগুলো পাহারা দিত এবং কাফেলাগুলোকে নিরাপদ পথ তৈরি করে পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তে পৌঁছে দিত। পিটার্স হিসেব করে দেখিয়েছেন যে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তালেবানদের বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল অংশ আসত এই মাদক পাইপলাইন থেকে। মাদকের অর্থ ছাড়া তাদের পক্ষে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে দুই দশক ধরে এত বড় পরিসরে আধুনিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।

একই রকম চিত্র দেখা যায় আফ্রিকার বিশাল সাহেল অঞ্চলে। সাহারা মরুভূমির সংলগ্ন এই দুর্গম এলাকায় আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব বা আকিম এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো গড়ে তুলেছে এক অদ্ভুত লাভজনক ব্যবসা। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে সমুদ্রপথে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে নেমে আসা শত শত টন কোকেন মরুভূমির ওপর দিয়ে উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে পাচার হয়। এই রুটের নাম দেওয়া হয়েছে হাইওয়ে টেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাটস বার্ডাল এবং ডেভিড এম. ম্যালোন তাদের সম্পাদিত গ্রন্থে যুদ্ধকালীন ছায়া অর্থনীতির এই বহুমুখী চরিত্রটি তুলে ধরেছেন (Berdal & Malone, 2000)।

সাহেল অঞ্চলের চরমপন্থীরা কোনো কোকেন চাষ করে না; তারা এই বিশাল মরুভূমির ওপর দিয়ে মাদক পারাপার করা আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর কনভয়কে সামরিক এসকর্ট প্রদান করে। একে বলা হয় সাহেল ট্রানজিট অর্থনীতি (Sahel Transit Economy)। প্রতিটি লরি পার করে দেওয়ার বিনিময়ে তারা কর আদায় করে। সেই অর্থ দিয়ে তারা বিশ্ববাজার থেকে বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নাইট-ভিশন গগলস এবং ভারী অস্ত্র কিনে থাকে। নিজেদের ধর্মীয় বিশুদ্ধতার দাবিদার এই যোদ্ধারা এভাবেই লাতিন আমেরিকান ড্রাগ মাফিয়াদের বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। মতাদর্শিক চরমপন্থা এবং অপরাধের এমন আত্মঘাতী মেলবন্ধন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের নিরাপত্তাকে এক চরম অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও লেভান্ট: হিজবুল্লাহ এবং ক্যাপ্টাগন যুদ্ধ

লেভান্ট বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিকে তাকালে মাদক ও আধুনিক ছায়াযুদ্ধের আরেক ভয়াবহ রূপ দৃশ্যমান হয়। লেবাননের রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিজবুল্লাহ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে পরিচিত নয়; মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তাদের একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অপরাধ শাখা রয়েছে। নিরাপত্তা গবেষক ম্যাথিউ লেভিট (Matthew Levitt) ২০১৩ সালে প্রকাশিত তার বিশদ গবেষণাগ্রন্থে হিজবুল্লাহর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের আর্থিক কাঠামোর স্বরূপ উন্মোচন করেন (Levitt, 2013)। লেভিট দেখিয়েছেন যে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং প্যারাগুয়ের সীমান্তে অবস্থিত কুখ্যাত ত্রি-সীমান্ত অঞ্চল (Tri-Border Area - TBA)-এ হিজবুল্লাহর অর্থায়ন নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।

হিজবুল্লাহর বৈদেশিক নিরাপত্তা শাখা বা ইউনিট ৯১০ ল্যাটিন আমেরিকার কোকেন পাচারকারীদের সাথে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের এক বিশাল ব্যবস্থা তৈরি করে। তারা কলম্বিয়ান ও মেক্সিকান কার্টেলগুলোর শত শত কোটি নোংরা ডলার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রিয়েল এস্টেট এবং গাড়ি আমদানির ব্যবসার মাধ্যমে সাদা করে দিত। এই অর্থপাচারের সেবার বিনিময়ে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক তহবিলের জন্য বিপুল কমিশন পেত। গবেষক স্টিভেন হাচিনসন এবং প্যাট ও'ম্যালি সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধের এই গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি টিকিয়ে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মাদক রুটের সুবিধা নেয় (Hutchinson & O'Maley, 2007)।

ছবিঃ দি ইকোনমিষ্ট  

তবে সমকালীন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে রক্তাক্ত মাদক নাটকের মঞ্চ হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া। ২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ যখন আসাদ সরকারের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদের ওপর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে, তখন দামেস্ক প্রশাসন বেঁচে থাকার জন্য এক অবিশ্বাস্য পথ বেছে নেয়। সিরিয়া রাতারাতি রূপান্তরিত হয় পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারকো-রাষ্ট্র (Narco-State)-এ। আর তাদের উৎপাদিত প্রধান পণ্য হয়ে ওঠে ফেনইথাইলিন ভিত্তিক সিন্থেটিক মাদক, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত লাভ করে ক্যাপ্টাগন নামে। একে অনেক সময় জিহাদি মাদকও বলা হয়, কারণ এটি সেবন করলে মানুষের ভয়, ক্লান্তি ও ক্ষুধার অনুভূতি সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায়।

সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর বিশেষ চতুর্থ ডিভিশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ভাই মাহের আল-আসাদ, তারা সরাসরি এই রাসায়নিক ট্যাবলেট তৈরির শত শত ল্যাবরেটরি স্থাপন করে। সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে কোটি কোটি ক্যাপ্টাগন বড়ি গোপনে রফতানি হতে থাকে সমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এই ক্যাপ্টাগন বাণিজ্য থেকে অর্জিত হাজার হাজার কোটি ডলার সরাসরি আসাদ সরকারের যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখে। সিরিয়ার অর্থনীতিতে আজ বৈধ বাণিজ্যের চেয়ে ক্যাপ্টাগন বিক্রির অর্থ অনেক গুণ বেশি। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যখন নিজেরাই আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের মতো আচরণ করে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের সমস্ত প্রচলিত সংজ্ঞা অকেজো হয়ে পড়ে।

প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও সংঘাত উত্তর শান্তি বিনির্মাণে মাদক অর্থের অভিঘাত 

যুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখনও মাদক অর্থনীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে কোনো সমাজ সহজে মুক্তি পায় না। সংঘাত পরবর্তী শান্তি বিনির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় এই যুদ্ধকালীন মাদক নেটওয়ার্কগুলো। জাতিসংঘের শান্তি মিশনগুলো যখন কোনো দেশে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করতে যায় এবং যোদ্ধাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেয়, তখন তারা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। একজন সাবেক গেরিলা যোদ্ধা, যে মাদক পাহারা দিয়ে মাসে হাজার হাজার ডলার উপার্জন করত, সে সরকারের শান্তি প্রকল্পের সামান্য বেতনের কৃষিকাজ বা দিনমজুরির জীবনে ফিরে যেতে চায় না। ফলে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মাঠপর্যায়ে অপরাধের কোনো সমাপ্তি ঘটে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষক লুইস আই. শেলি (Louise I. Shelley) ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার আকর গ্রন্থ ডার্টি এনট্যাঙ্গেলমেন্টস (Dirty Entanglements)-এ সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ এবং দুর্নীতির এই ত্রিমুখী সংঘাত চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Shelley, 2014)। শেলি দেখান যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কীভাবে সাবেক বিদ্রোহীরা রাতারাতি রূপান্তরিত হয় পেশাদার অপরাধী সিন্ডিকেটে। এরা শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার জন্য কাজ করে, যাদের শান্তি বিনির্মাণের তত্ত্বে বলা হয় শান্তি বিনষ্টকারী (Spoilers of Peace)। কলম্বিয়ায় ২০১৬ সালে সরকারের সাথে ফার্কের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। দলের মূল নেতৃত্ব অস্ত্র সমর্পণ করলেও মাঠপর্যায়ের শত শত কমান্ডার দল ত্যাগ করে গড়ে তোলে ফার্ক ডিসিডেন্ট গ্রুপ, যারা আজ নতুন করে আমাজনের কোকা উপত্যকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

এর সাথে যুক্ত হয় অস্ত্র ও মাদক মিথোজীবিতা (Arms-Drugs Nexus)-এর এক অনন্ত চক্র। সংঘাতের সময় সীমান্ত দিয়ে যেসব চোরাই অস্ত্র প্রবেশ করেছিল, যুদ্ধ শেষে সেগুলো জমা পড়ে না। বরং সেই ভারী অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয় মাদক রুটগুলো পাহারা দিতে। মাদক অর্থায়নের ফলে স্থানীয় পুলিশ, বিচারক এবং নবগঠিত বেসামরিক প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি এমন এক স্তরে পৌঁছে যায় যে আইনের শাসন কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমস্ত উন্নয়ন অনুদান এই অদৃশ্য দুর্নীতির গর্ভে হারিয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং পুনরায় কোনো নতুন সশস্ত্র নেতার পতাকাতলে আশ্রয় খোঁজে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, মাদক অর্থ কেবল একটি যুদ্ধের রসদ জোগায় না; এটি যুদ্ধের বীজকে সমাজের মাটির নিচে চিরকালের জন্য পুঁতে রেখে যায়। যে সমাজ একবার মাদক নির্ভর যুদ্ধ অর্থনীতির স্বাদ পায়, সেই সমাজের ক্ষত শুকাতে কয়েক প্রজন্ম পার হয়ে যায়। সহিংসতা ও মাদকের এই দুষ্টচক্র ভেঙে বের হতে হলে কেবল বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই জটিল আন্তর্জাতিক আর্থিক চেইন ধ্বংস করা যা এই অন্ধকার অর্থকে বৈধ অর্থনীতিতে প্রবেশ করায়। যতক্ষণ পর্যন্ত সংঘাত কবলিত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জন্য টেকসই, নিরাপদ এবং লাভজনক বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বুলেট আর মাদকের এই সর্বগ্রাসী মৈত্রী বিশ্বজুড়ে একের পর এক সমাজকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতেই থাকবে।

মন্তব্য করুন

Logo