Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

প্রতিবাদের নামে সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস

ছবিঃ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি

প্রতিবাদের নামে সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম

রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে নিজের জীবনের অনেক অনুভূতি আরও স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। তাঁর কবিতা পড়ে কখনো পরিচিত দুঃখের কাছে ফিরে যাই, কখনো ভালোবাসার কথা আরও সহজে বলতে পারি। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকেই তাঁর গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভের সঙ্গে কষ্ট অনুভব করছি। দেয়ালে আঁকা মুখটির ওপর কালো রং লাগানোর দৃশ্য মনে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে ভাবছি, আমাদের চারপাশের শিল্পকর্ম কত সহজে আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠছে। নিজের অপছন্দ প্রকাশ করতে অন্যের সৃষ্টিকে নষ্ট করার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া দরকার।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ঢাকার সেগুন বাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় এক নারীসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্য সচিব আ ন ম আয়াস রয়েছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ওই নারী ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোর কথা বলেছেন। ১১ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে মামলা ও চারজনের রিমান্ডের তথ্য এসেছে। অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে আদালতে। ঘটনাটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েও এই পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, জমিদারি জীবন, সমাজভাবনা ও সাহিত্য নিয়ে সমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। একজন লেখকের প্রতি ভালোবাসা তাঁর প্রতিটি বক্তব্য মেনে নেওয়ার বাধ্য বাধকতা তৈরি করে না। তাঁর লেখায় সীমাবদ্ধতা থাকলে পাঠ থেকে উদাহরণ তুলে আলোচনা করা যায়। ঐতিহাসিক অভিযোগ তুললে নির্ভরযোগ্য দলিল দিতে হয়। যুক্তির মুখোমুখি যুক্তি দাঁড়ালে পাঠকেরও জানার সুযোগ বাড়ে। প্রতিকৃতিতে কালি ঢেলে সেই আলোচনার কোনো অগ্রগতি হয় না। সেখানে লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে তর্কের পরিবর্তে তাঁর উপস্থিতি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। এমন আচরণ অসভ্য, অসহিষ্ণু এবং নিন্দনীয়।

ভারত সরকারের কোনো নীতি নিয়ে আপত্তি থাকলে সেই নীতি, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও তার ক্ষতির কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি লাগিয়ে সমকালীন রাষ্ট্রনীতির জবাব দেওয়ার চেষ্টা চিন্তার অসংগতি প্রকাশ করে। একজন লেখকের জন্মস্থান দিয়ে তাঁর সমস্ত রচনার অর্থ নির্ধারণ করা যায় না। বাংলা ভাষায় লেখা সাহিত্য সীমান্তের দুই পাশের পাঠকের কাছেই পৌঁছায়। রবীন্দ্রনাথের রচনা বাংলাদেশের পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে গ্রহণ করেছেন। সেই সম্পর্ককে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক আচরণের সঙ্গে এক করে ফেললে আমাদের নিজেদের পাঠ ও সাংস্কৃতিক চর্চাকেই আঘাত করা হয়।

জনপরিসরে কার প্রতিকৃতি থাকবে, কাদের অবদান বেশি গুরুত্ব পাবে, এসব নিয়ে নাগরিকের মত দেওয়ার অধিকার আছে। অঞ্চল, পেশা ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও কথা উঠতে পারে। কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া যায়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা যায়। এমন আলোচনায় জনপরিসরের শিল্প আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু নিজের পছন্দকে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রং হাতে অন্যের শিল্পকর্ম মুছতে নামলে নাগরিক আলোচনার জায়গা দখল করে জবরদস্তি। তখন অন্য মানুষের দেখার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেয়ালের গ্রাফিতির সঙ্গে শিল্পীর শ্রম, পরিকল্পনা ও সৃষ্টির অধিকার জড়িত। পথচারীরা সেখানে থেমে পরিচিত মুখগুলোর পাশাপাশি অপরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও জানতে পারেন। যাঁরা শিল্পকর্মটি তৈরি করেছেন, তাঁদের কাজ নষ্ট হলে পুনরুদ্ধারে সময় ও অর্থ লাগে। কোনো বিখ্যাত মানুষের প্রতিকৃতিতে আক্রমণ ঘটলে আমরা দ্রুত প্রতিবাদ করি। একই উদ্বেগ অচেনা শিল্পীর কাজের ক্ষেত্রেও থাকা দরকার। শিল্পকর্ম রক্ষার সিদ্ধান্ত ব্যক্তির জনপ্রিয়তা অনুসারে বদলালে সুরক্ষা অসম হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি রক্ষার সঙ্গে জনপরিসরের সব শিল্পকর্মের নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত করতে হবে।

সংবাদে এসেছে, গ্রাফিতিতে লাগানো কালি মুছতে এগিয়ে আসেন এক রিকশাচালক। তাঁর এই উদ্যোগ আমাকে আশ্বস্ত করেছে। সংবাদে প্রকাশিত সীমিত তথ্য থেকে তাঁর সাহিত্যপাঠ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব হয় না। যতটুকু জানা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিকৃতির সামনে তিনি থেমেছেন এবং কালি সরানোর চেষ্টা করেছেন। শিল্প রক্ষায় এমন নাগরিক উদ্যোগের গুরুত্ব আছে। তবে একজন পথচারীর আন্তরিকতার ওপর জনপরিসরের সুরক্ষার দায় ছেড়ে দেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতি নিরূপণ, পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে হবে। 

ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নারী পরিচয়কে কেন্দ্র করে আক্রমণ করাও অনুচিত। তাঁর কাজের সমালোচনা করতে হলে সেই কাজের ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে হবে। নারী সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, পোশাক নিয়ে কটূক্তি, ব্যক্তিগত অপমান ঘটনার আলোচনাকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। একইভাবে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে কোনো সম্প্রদায়কে দায়ী করলে আরও মানুষ অপমানিত হন। কারা ঘটনায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন, কারা নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো প্রস্তুতি ছিল কি না, তদন্তে সেসব নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। দায় ব্যক্তির কাজ অনুসারে স্থির হবে। ক্ষোভ প্রকাশের সময়ও ভাষায় সংযম রাখতে হবে।

আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির সঙ্গে যথাযথ তদন্তের দাবিও রাখতে হবে। কালি দেওয়ার দৃশ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করা জরুরি। মামলা হয়েছে বলেই সব অভিযোগ সত্য ধরে নেওয়া যায় না। গুরুতর অভিযোগ আনলে তার পক্ষে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদ ও হেফাজতে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। শিল্পকর্মের ক্ষতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্বিচার শাস্তির সমর্থন করলে ন্যায্য জবাবদিহির উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনসম্মত নিষ্পত্তিই এখানে প্রত্যাশিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ জমে। সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে কেউ প্রচার পেতে পারেন। এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে সংবাদমাধ্যমকে তথ্য, অভিযোগ ও মন্তব্যের পার্থক্য স্পষ্ট রাখতে হবে। একই দৃশ্য বারবার প্রচারের সঙ্গে শিল্পীর বক্তব্য, ক্ষতির পরিমাণ, পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি এবং কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপও জানানো দরকার। ভুল পরিচয় ছড়ানো, অসম্পূর্ণ বক্তব্য থেকে উদ্দেশ্য স্থির করা, অযাচাইকৃত অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করা পরিহার করতে হবে। প্রতিবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের নির্ভুলতার ওপর। আবেগ যত তীব্র হয়, যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বাড়ে।

আমাদের পাঠের অভ্যাস নিয়েও ভাবা দরকার। রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা ও বিরোধিতা করে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু তাঁর গল্পের চরিত্র, কবিতার অনুভূতি ও প্রবন্ধের যুক্তি নিয়ে আলোচনা কম হয়। তাঁর লেখা পড়ে আলোচনা করার চেয়ে তাঁকে সমর্থন ও বিরোধিতা করাই প্রধান হয়ে উঠলে তাঁর নাম ধীরে ধীরে স্লোগানে পরিণত হবে। তখন তাঁকে গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আসে শোনা কথা থেকে। বিদ্যালয়, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পাঠের আয়োজন করতে পারে। সেখানে ভিন্ন মতের মানুষও কথা বলবেন। কারও আপত্তি শুনে তাঁকে অপমান না করে সংশ্লিষ্ট লেখা নিয়ে আলোচনা করা গেলে ভুল ধারণা সংশোধনের সুযোগ থাকে। পাঠকের কাছে বই পৌঁছানো, সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কাজ। প্রতিকৃতি রক্ষার পাশাপাশি এই কাজগুলো চললে লেখকের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ব্যক্তিগত ও চিন্তাশীল হতে পারে। সেই সম্পর্ক ধরে রাখতে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নিয়মিত তাঁর সাহিত্য পড়তে হবে, গান শুনতে হবে।

পুনরুদ্ধারের কাজেও সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের যুক্ত করা উচিত। কী ধরনের রং লাগানো হয়েছে, আগের রঙের কতটা ক্ষতি হয়েছে, কীভাবে তা পরিষ্কার করলে মূল কাজ অক্ষত থাকবে, সেসব বিবেচনা করতে হবে। দ্রুততার চাপে নতুন ক্ষতি ঘটানো চলবে না। দেয়ালটির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে, কীভাবে এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। অভিযোগ জানানোর সহজ পথ এবং ক্ষতির খবর পেলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে। শিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে শিল্পকর্মের সামান্য ক্ষতিও দ্রুত শনাক্ত করে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এতে ক্ষতি আরও বাড়ার আশঙ্কা কমে। পুনরুদ্ধারে কত খরচ হচ্ছে এবং কাজ কতটা এগিয়েছে, তা নাগরিকদের জানাতে হবে।

রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসার একটি অর্থ তাঁর লেখা পড়া, গান শোনা, সৃষ্টির সঙ্গে নিজের জীবনের কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। তাঁর সমালোচনা করার অর্থও মন দিয়ে পড়ে নিজের আপত্তি স্পষ্ট করা। কালি মেখে সেই দীর্ঘ সম্পর্ক মুছে ফেলা যায় না। তবু ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালটি আমাদের সামনে বাস্তব দায় রেখে যায়। গ্রাফিতি পুনরুদ্ধার করতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্য শিল্প কর্মগুলোর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। আমি এমন জনপরিসর চাই, যেখানে আমার প্রিয় কবির পাশে অন্যের প্রিয় শিল্পীরও স্থান থাকবে। আমাদের মতের অমিল থাকবে, তবু শিল্পকর্ম অক্ষত থাকবে।

মন্তব্য করুন

Logo