Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি: হলিউডের পর্দার বাইরে যে গল্প বন বাঁচানোর

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

ফিচার

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি: হলিউডের পর্দার বাইরে যে গল্প বন বাঁচানোর

Icon

কে এম তাহছিন (মুগ্ধ)

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম

শুটিং করতে গিয়ে কম্বোডিয়ার মানুষের জীবন ও পরিবেশের সংকট কাছ থেকে দেখেছিলেন হলিউড তারকা। পরে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে যুক্ত করে মানবিক ও পরিবেশ সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে। হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির পরিচিতি বিশ্বজুড়ে। তবে অভিনয়ের বাইরেও দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা, শরণার্থী অধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করে আসছেন তিনি। আর তাঁর এই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায়—যেখানে একটি সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন জোলি। গুডউইল অ্যাম্বাসেডর এবং পরে স্পেশাল এনভয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বিশ্বের বিভিন্ন সংকটপূর্ণ এলাকায় গিয়ে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিস্থিতি সরাসরি দেখেছেন তিনি। তাঁর এই মানবিক কাজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সিনেমার শুটিং থেকে শুরু নতুন অধ্যায়
২০০০ সালে Lara Croft: Tomb Raider সিনেমার শুটিংয়ের জন্য কম্বোডিয়ায় যান অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সিনেমার দৃশ্যের বাইরের বাস্তব কম্বোডিয়া তাঁকে নাড়া দেয়।
দীর্ঘ সংঘাত ও যুদ্ধের ক্ষত তখনও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে স্পষ্ট। একই সঙ্গে বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী পাচারের মতো সমস্যা দেশটির প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।
কার্ডামম পর্বতমালা ও স্যামলাউট অঞ্চলের মতো বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী শিকার ছিল বড় উদ্বেগের বিষয়। জীবিকার সীমিত সুযোগের কারণে স্থানীয় কিছু মানুষও অবৈধ শিকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। এই বাস্তবতা জোলিকে শুধু উদ্বিগ্ন করেনি; বরং তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি কিছু করার কথা ভাবায়।

কম্বোডিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক
কম্বোডিয়ায় কাজ করতে গিয়ে দেশটির মানুষের সঙ্গে জোলির সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ২০০২ সালে তিনি কম্বোডিয়া থেকে তাঁর প্রথম সন্তান ম্যাডক্সকে দত্তক নেন।
এর পরের বছর, ২০০৩ সালে, কম্বোডিয়ার পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ম্যাডক্স জোলি-পিট ফাউন্ডেশন  (Maddox Jolie-Pitt Foundation)।
ফাউন্ডেশনের কাজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করা। অর্থাৎ, পরিবেশ সংরক্ষণকে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেই এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

শিকারি থেকে বনরক্ষী
জোলির উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি ছিল স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের কাজে যুক্ত করা।
জীবিকার প্রয়োজনে যারা আগে অবৈধ শিকারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের একটি অংশকে বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত আয়ের সুযোগ দিয়ে বনরক্ষী হিসেবে কাজে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। যারা একসময় বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতেন, তারাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বন রক্ষার অংশীদার।
এই পদ্ধতির পেছনে ছিল একটি বাস্তব ধারণা—শুধু আইন প্রয়োগ করে শিকার বন্ধ করা যথেষ্ট নয়; স্থানীয় মানুষের সামনে বিকল্প জীবিকার সুযোগও তৈরি করতে হবে।

সংরক্ষণের আওতায় আসে বিশাল বনাঞ্চল
সময়ের সঙ্গে এই উদ্যোগের পরিধি বাড়তে থাকে। বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার উন্নয়নকে সমন্বিত করে পরিচালিত কার্যক্রম একটি বড় সংরক্ষণ কাঠামো তৈরি করে। প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে পরিচালিত সংরক্ষণ কার্যক্রম কম্বোডিয়ার পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একসময় অবৈধ শিকার ও বন ধ্বংসের সমস্যায় জর্জরিত অঞ্চলটি ধীরে ধীরে সংরক্ষণের আওতায় আসে। জোলির এই ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে কম্বোডিয়া সরকার তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেয়।

তারকা পরিচয়ের বাইরে যে শিক্ষা
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির কম্বোডিয়া অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো তাঁর তারকা পরিচয় নয়; বরং সমস্যার সমাধানে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করার পদ্ধতি।
একজন মানুষ যদি জীবিকার জন্য অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকার করেন, তাহলে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। কিন্তু সেই মানুষটির জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁকেই পরিবেশ সংরক্ষণের অংশীদারে পরিণত করা সম্ভব।

কম্বোডিয়ার এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পরিবেশ রক্ষার লড়াই শুধু গাছ ও প্রাণীকে বাঁচানোর লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, জীবিকা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ।
হলিউডের আলো থেকে বহু দূরে কম্বোডিয়ার বনভূমিতে শুরু হওয়া অ্যাঞ্জেলিনা জোলির এই যাত্রা তাই একজন তারকার দাতব্য কাজের গল্পের চেয়েও বড়। এটি মনে করিয়ে দেয়—সঠিক উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করলে একটি বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।

এই বিষয়ে বিস্তারিত ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন: 

Facebook: https://www.facebook.com/share/v/1Bb1kMRQCL/

YouTube: https://youtube.com/shorts/_iIjjRyZvnA?si=ieTdjBA5cAmk3q3e

মন্তব্য করুন

Logo